গাজায় খাদ্যসংকট আরও তীব্র হওয়ায় একবেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে বহু পরিবার। অনিয়মিত কমিউনিটি রান্নাঘর, খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং সীমিত ও অনিশ্চিত মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করেই দিন কাটছে তাদের।
গাজা সিটির বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাসকারী ৪৫ বছর বয়সী মারভাত রাদওয়ানের পরিবারে সদস্য সাতজন। যেদিন শিবিরের কাছের কমিউনিটি রান্নাঘরে খাবার দেওয়া হয়, সেদিন কিছুটা স্বস্তি পান তিনি। ছোট ভাগনে উবাইকে সঙ্গে নিয়ে রান্নার পাত্র হাতে খাবার সংগ্রহ করতে যান।
তবে রান্নাঘরের দেওয়া খাবার সাতজনের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই ত্রাণের প্যাকেট থেকে পাওয়া টুনা, বিনস বা মটরশুঁটি দিয়ে খাবার বাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন মারভাত।
গাজায় নিম্ন বা কোনো আয় নেই— এমন পরিবারের জন্য কমিউনিটি রান্নাঘর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস। কিন্তু অর্থসংকট ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব রান্নাঘরের কার্যক্রম কমে গেছে। জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি ১৬৫টি রান্নাঘর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ খাবার সরবরাহ করা হলেও জুলাইয়ে ১০২টি রান্নাঘর থেকে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৬ লাখ ৯৮ হাজারে।
মারভাতের পরিবারের সংকট আরও গভীর। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার ভাই মোহাম্মদ, ভাবি আনোয়ার ও তাদের এক বছর বয়সী ছেলে ইউসুফ নিহত হওয়ার পর তিন ভাগনের দায়িত্ব নেন তিনি। বেঁচে যাওয়া সন্তানদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী নায়েফের মাথায় বোমার স্প্লিন্টার ঢুকে যায়। ১১ বছর বয়সী হাবিব শরীরে দগ্ধ হয় এবং উবাইও গুরুতর দগ্ধ হয়েছিল।
গত নয় মাস ধরে দেইর আল-বালাহ এলাকায় তারা একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন। মারভাতের সঙ্গে রয়েছেন তার ৭০ বছর বয়সী বাবা ও ৪০ বছর বয়সী বোন। পরিবারের কারও নিয়মিত আয় নেই। ফলে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর জন্য ত্রাণ ও দাতব্য সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।
খাবার কম পড়লে বড়রা না খেয়ে থাকেন, যাতে শিশুরা অন্তত পেট ভরে খেতে পারে। মারভাত বলেন, তার বৃদ্ধ বাবা নাতি-নাতনিরা যথেষ্ট খেয়েছে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিজেও খাবার খান না।
মাংস পরিবারের নাগালের বাইরে। তাজা সবজিও অপ্রতুল এবং দাম বেশি। হাবিবের শারীরিক অবস্থার জন্য নিয়মিত শসা ও পর্যাপ্ত পানি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। কিন্তু গাজায় এক কেজি শসার দাম প্রায় ১৫ শেকেল এবং টমেটোর দাম ১০ থেকে ১২ শেকেল হওয়ায় সেগুলো কেনাও কঠিন।
খাদ্যের এই সংকট শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে। প্রায় এক বছর ধরে কিডনিতে পাথরের সমস্যায় ভুগছে হাবিব। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত লবণযুক্ত ও প্রায় পুরোপুরি কৌটাজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীল খাদ্যাভ্যাস এর অন্যতম কারণ।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, জুলাইয়েও গাজার প্রায় ৭৭ শতাংশ পরিবার উচ্চমূল্যের কারণে তাজা সবজি, ফল ও প্রোটিনজাত খাবার সংগ্রহে সমস্যার কথা জানিয়েছে।
ফলে ত্রাণ ও দাতব্য সহায়তা অনেক পরিবারকে কোনোভাবে বাঁচিয়ে রাখলেও খাদ্যের বৈচিত্র্যের অভাব তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সময়ের আলো/জেডি