ফিলিপাইনের পালাওয়ান প্রদেশের পর্যটনকেন্দ্র কোরনের কাছে একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এখনো ৮৬ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। দেশটির কোস্টগার্ড জানিয়েছে, আগুন লাগার পর এখন পর্যন্ত ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় ভোর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এমভি জুন অ্যাস্টার নামের ফেরিটিতে মোট ১৩৪ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে ১১৭ জন যাত্রী এবং ১৭ জন ক্রু সদস্য।
ফেরিটি ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার বন্দর থেকে ছেড়ে জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা কোরনের দিকে যাচ্ছিল। পথে পালাওয়ান প্রদেশের কোরন এলাকার সমুদ্রসীমায় ফেরিটিতে আগুন ধরে যায়।
ফিলিপাইন কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে ফেরিটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলের আবহাওয়াও ছিল প্রতিকূল। সমুদ্রে ঢেউ ছিল প্রবল এবং স্রোত ছিল শক্তিশালী।
কোস্টগার্ড জানায়, আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তাদের সদস্যদের একই সময়ে ফেরিটির আশপাশের সমুদ্র এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধান চালাতে হচ্ছে।
শক্তিশালী স্রোতের কারণে ফেরিটি প্রথমে যে জায়গায় বিপদসংকেত পাঠিয়েছিল, সেখান থেকে প্রায় ৭ দশমিক ৬৮ নটিক্যাল মাইল দূরে সরে যায়।
প্রাথমিকভাবে ফেরিটি বারাঙ্গাই তুর্দা এলাকার প্রায় চার নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল বলে জানানো হয়েছিল।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৮ জন যাত্রী এবং চারজন ক্রু সদস্য থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও একজনকে উদ্ধার করা হয়।
কোস্টগার্ড জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে এখনো বিস্তারিত কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফলে আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কর্তৃপক্ষ বলছে, আগুনের কারণ তদন্তাধীন।
কোস্টগার্ডের ক্যাপ্টেন নোয়েমি কায়াবিয়াব জানিয়েছেন, যাত্রী ও ক্রুদের তালিকা অনুযায়ী ফেরিটিতে মোট ১৩৪ জন ছিলেন।
উদ্ধার ও নিহতদের হিসাব বাদ দেওয়ার পর বর্তমানে ৮৬ জনকে নিখোঁজ বা এখনো অনুপস্থিত হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তবে কোস্টগার্ড সতর্ক করে বলেছে, এটি একটি চলমান অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান। ফলে নিখোঁজের সংখ্যা পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে।
কোস্টগার্ড নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যাদের কোনো আত্মীয় ফেরিটিতে ছিলেন এবং এখনো ফিরে আসেননি, তারা যেন দ্রুত কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। এতে যাত্রী ও ক্রুদের সঠিক হিসাব তৈরি করা সহজ হবে।
ফিলিপাইন কোস্টগার্ড জানিয়েছে, নিখোঁজদের উদ্ধারে ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ বা সরকারের সর্বাত্মক সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কোস্টগার্ডের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বেচ্ছাসেবী জেলেদের সম্প্রদায়ও উদ্ধার অভিযানে সহযোগিতা করছে।
একজন কোস্টগার্ড মুখপাত্র বলেন, পরিস্থিতিতে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তারা নিরলসভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিখোঁজদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, স্বজনদের অপেক্ষা ও উদ্বেগের বিষয়টি তারা বুঝতে পারছেন।
ঘটনার পর থেকেই সমুদ্রের বৈরী পরিস্থিতি উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোস্টগার্ড জানিয়েছে, বুধবার রাতে আবহাওয়া খারাপ ছিল এবং সমুদ্রে ঢেউ ছিল শক্তিশালী। এর পাশাপাশি ওই এলাকায় তীব্র স্রোতও ছিল।
স্রোতের কারণে আগুনে আক্রান্ত ফেরিটি তার প্রাথমিক অবস্থান থেকে আরও দূরে ভেসে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দলকে বড় এলাকায় অনুসন্ধান চালাতে হচ্ছে।
কোরনের একজন পৌর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, যিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি, স্থানীয় পরিস্থিতিকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি জানান, আগুনের ঘটনায় আহত ও নিহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার কাজে তিনি নিজেও অংশ নিয়েছেন।
তার ভাষায়, কোরনে এমন ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি এবং ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রধান বন্দরে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগায় উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়ে।
যে কোরনের দিকে ফেরিটি যাচ্ছিল, সেটি ফিলিপাইনের পালাওয়ান প্রদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা।
কোরন দ্বীপ তার স্বচ্ছ নীল পানি, উঁচু পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে স্কুবা ডাইভিং বা পানির নিচে ডাইভিংয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছে এটি জনপ্রিয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া জাপানি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখতে বিপুলসংখ্যক ডুবুরি সেখানে যান।
প্রায় ৭ হাজার ১০০ দ্বীপের দেশ ফিলিপাইনে দ্বীপগুলোর মধ্যে যাতায়াতের জন্য ফেরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দ্বীপে বিমান যোগাযোগ সীমিত বা অনুপস্থিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে ফেরি তুলনামূলক সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা।
তবে খারাপ আবহাওয়া, বর্ষাকাল, টাইফুন এবং উত্তাল সমুদ্রের কারণে দেশটিতে নৌদুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি।
এর আগেও দেশটিতে ফেরি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে এমভি লেডি মেরি জয় থ্রি নামের একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে আগুন লেগে ৩১ জন নিহত হন।
ওই ফেরিটি জাম্বোয়াঙ্গা শহর থেকে বাসিলান দ্বীপের দিকে যাচ্ছিল।
কর্তৃপক্ষের মতে, অতীতের কিছু নৌদুর্ঘটনার পেছনে জাহাজের দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এমভি জুন অ্যাস্টারের আগুনের ঘটনায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো নিখোঁজ ৮৬ জনের সন্ধান।
কোস্টগার্ড, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে শক্তিশালী স্রোত, ঢেউ ও প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধার অভিযানকে কঠিন করে তুলছে।
আগুনের কারণ এখনো জানা যায়নি এবং নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা উদ্ধার অভিযান এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।
সূত্র : বিবিসি
সময়ের আলো/ইউএমএইচ