সৌদিতে হামলা : হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ইরানকে পাকিস্তানের কঠোর বার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

সৌদি আরবে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে পাকিস্তান। সংকট যাতে আরও

2026-09-10T12:01:01+00:00
2026-09-10T12:15:24+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
রয়টার্স এক্সক্লুসিভ
সৌদিতে হামলা : হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ইরানকে পাকিস্তানের কঠোর বার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০১ পিএম  আপডেট: ১০.০৯.২০২৬ ১২:১৫ পিএম
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তেহরানে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। ছবি : রয়টার্স
সৌদি আরবে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের ধারাবাহিক হামলার প্রেক্ষাপটে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে পাকিস্তান। সংকট যাতে আরও বিস্তৃত না হয়, সে লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবেই ইসলামাবাদ তেহরানকে এই বার্তা দিয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র। 

একই সঙ্গে সৌদি আরবে হামলা আরও বিস্তৃত হলে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার হুতিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত শহরের একটি বিমানঘাঁটি এবং এর আশপাশের কয়েকটি শহরের তেল অবকাঠামোয় হামলা চালায়। ওই হামলায় ৭৩ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি আরবে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি।

পরদিন বুধবার হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, এর আগের ১২ ঘণ্টায় সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, এসব হামলার জবাব দেওয়া হবে এবং এর জন্য শাস্তিও দেওয়া হবে।

সৌদি-তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি

এমন পরিস্থিতিতেই হুতিদের হামলা নিয়ন্ত্রণে ইরানের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছে পাকিস্তান। সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকায় ইসলামাবাদের এই সতর্কবার্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

পাকিস্তান জানিয়েছে, সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবে হামলা আরও বিস্তৃত হলে রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদকে নিয়ে যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

পাকিস্তানি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আসিফ বলেন, একটি দেশের ওপর আগ্রাসনকে তিনটি দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাঁর ভাষায়, বিনা উসকানিতে সৌদি আরবে হামলা বা আগ্রাসন ছড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করার বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই।

তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

ইরানের প্রতি বার্তা: হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করুন

সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আসা পাকিস্তানের এই উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, হুতিদের হামলা নিয়ে ইসলামাবাদ কতটা উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, তেহরানের প্রতি পাকিস্তানের বার্তা স্পষ্ট—হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যথায় এই প্রক্সি সংঘাত আরও বড় আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হতে পারে।

এক জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান ইরানের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সৌদি আরবে হুতি হামলা বন্ধে তেহরান যেন নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে, সেই আহ্বানও জানানো হয়েছে।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মঙ্গলবার পাকিস্তান তেহরানের কাছে বার্তাটি পৌঁছে দেয়। তবে এর জবাবে ইরান জানিয়েছে, ‘হুতিদের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ নেই’।

অন্যদিকে, দুই ইরানি সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহে তেহরানই হুতিদের সৌদি আরবে হামলা চালাতে বলেছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান হুতিদের অতিরিক্ত অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। পাশাপাশি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কয়েকজন কমান্ডার হামলার সমন্বয়ে সহায়তা করতে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন।

পাকিস্তানের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা

এক আঞ্চলিক কূটনীতিকের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে ইসলামাবাদ। কারণ পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে রিয়াদ পাকিস্তানের কাছে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার অনুরোধ করতে পারে।

ওই কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি চুক্তি রয়েছে। তবে তাঁর আশা, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাবে না যে পাকিস্তানকে সরাসরি যুদ্ধে নামতে হবে। আপাতত ইসলামাবাদ কূটনৈতিক সমাধানের পথেই থাকবে।

এদিকে পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে, রিয়াদে পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সৌদি কর্মকর্তারা। সেখানে সম্ভাব্য পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে।

তিন দেশ একমত হয়েছে, তাদের সেনারা ইয়েমেনে প্রবেশ করবে না। সম্ভাব্য যেকোনো পাল্টা ব্যবস্থা সৌদি ভূখণ্ড থেকেই পরিচালিত হবে।


আরেক পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, পাল্টা হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাঁর মতে, রিয়াদের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক চুক্তিটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক এবং এর আওতা সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

ওই সূত্র আরও বলেন, সৌদি আরবের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনী সামরিক, কারিগরি, স্থল বা বিমান সহায়তা দিতে পারে। তবে দেশের বাইরে কোনো যুদ্ধ অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনী অংশ নেবে না।

আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ

আঞ্চলিক ওই কূটনীতিক মনে করেন, ইরান ও হুতিদের বর্তমান চাপ প্রয়োগের কৌশল শেষ পর্যন্ত তেহরানের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বন্দর অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য করা। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালানোর ফলে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো বরং আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারে। এতে তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হওয়ার বদলে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের ধারণা, ওয়াশিংটন আপাতত নিজের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

ওই কূটনীতিকের মতে, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ বহাল রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে একই সময়ে কাতার নীরবে এমন কিছু নতুন প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরানো সম্ভব হতে পারে।

সৌদির সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ

আরেক আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব সামরিক জবাব দিলে সেটি ইরানের বিরুদ্ধে নয়, মূলত হুতিদের লক্ষ্য করেই দেওয়া হবে।

সৌদি কর্মকর্তারাও মনে করেন না, হুতিদের মাধ্যমে হামলা চালিয়ে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

ওই সূত্রের মতে, সৌদি আরব ওয়াশিংটনের ওপর অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেবে, এমন সম্ভাবনাও কম। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপই ইরানকে আলোচনায় আনতে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।

সূত্রটি বলেন, এখন মূল প্রশ্ন হলো ইরান কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে এবং কতদিন তা চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে। তাঁর মতে, ট্রাম্প সামরিক সমাধানের পথে যেতে চান না; বরং অবরোধের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়াতে চান।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   সৌদি  হামলা  হুতি  ইরান  পাকিস্তান 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: