চার বোনের পর জন্ম আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের। পরিবারের একমাত্র ছেলে। তাই ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সবার আদরের। সংসারের অভাব ঘোচাতে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর ২০১৮ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। এরপর ধীরে ধীরে তিনিই হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান ভরসা।
প্রায় ২০ দিন আগে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন পিয়াস। ফায়ারিং প্রশিক্ষণ শেষে তার টাঙ্গাইলে বদলি হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে ছুটি নিয়ে আবার বাড়িতে আসবেন—এমন কথাই জানিয়েছিলেন পরিবারকে। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো অন্যভাবে। বাড়ি ফেরলেন ঠিকই, কিন্তু প্রাণহীন। ফায়ারিং প্রশিক্ষণের সময় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে নিথর হয়ে ফিরলেন পিয়াস।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে বুধবার প্রশিক্ষণের সময় ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় ঘটে আকস্মিক দুর্ঘটনা। এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুই সেনাসদস্য নিহত এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। নিহতদের একজন আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
পিয়াসের বাড়ি নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সোন্দলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া গ্রামের মুন্সী সর্দার বাড়িতে। তাঁর বাবা আবদুল ওয়াহাব আগে মুদিদোকান চালাতেন। বর্তমানে বাড়িতেই থাকেন। চার বোনের একমাত্র ভাই পিয়াস মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামের সেনা কোয়ার্টারে থাকতেন।
২০২৩ সালে বিয়ে করেন পিয়াস। তাঁদের ১৮ মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিও ছিলেন তিনি।
পিয়াসের মৃত্যুর খবর বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পরিবারের কাছে পৌঁছায়। এরপর থেকেই মা পারভিন আক্তার বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাবা আবদুল ওয়াহাবও যেন বাকরুদ্ধ। কারও সঙ্গে কথা বলছেন না।
পিয়াসের চাচাতো ভাই মিজানুর রহমান বলেন, ‘পিয়াসের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই চাচা আবদুল ওয়াহাব নিস্তব্ধ হয়ে রয়েছেন। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না। পিয়াসকে নিয়ে সবার অনেক স্বপ্ন ছিল। তাঁর এই মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।’
শুধু পরিবারের সদস্যদের কাছেই নয়, প্রতিবেশীদের কাছেও প্রিয় ছিলেন পিয়াস। স্বজনেরা জানান, ছোটবেলা থেকেই শান্ত, ভদ্র ও অমায়িক স্বভাবের ছিলেন তিনি। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। সহজ-সরল আচরণে আপন করে নিতেন সবাইকে।
পিয়াসের ভগ্নিপতি আবু সাঈদ বলেন, ‘পিয়াস ছিল চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই। ছোটবেলা থেকেই শান্ত ও সহজ-সরল স্বভাবের ছিল। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলত। তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত অমায়িক। এ কারণে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছেও সে খুবই প্রিয় ছিল।’
বৃহস্পতিবার সকালে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে পিয়াসের মরদেহ নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর শহীদ বুলু স্টেডিয়ামে আনা হয়। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে।
মরদেহ পরিবারের সদস্যদের দেখানোর পর দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মালিপাড়া গ্রামের মুন্সী সর্দার বাড়ির সামনে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। জানাজা ও গার্ড অব অনার শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় পিয়াসকে।
শেষবারের মতো ছেলেকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা। স্বামীকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে যান পিয়াসের স্ত্রী। পাশে ছোট্ট সন্তান—যে হয়তো এখনো বুঝতেই পারেনি, তার বাবা আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবেন না।
পিয়াসের চলে যাওয়ায় শুধু একজন সেনাসদস্যকে হারায়নি পরিবারটি; হারিয়েছে তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকেও। মা-বাবা, স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে রেখে তাঁর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। স্থানীয়রাও পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূদম পুষ্প চাকমা বলেন, বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে ফোন করে তাঁকে আবু বকর সিদ্দিকের মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়। পরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্যানেল চেয়ারম্যানকে পাঠিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে