বাঁশবাড়িয়া ঘাট সংলগ্ন এলাকা থেকে ৩টি ট্রাকসহ দুই পাচারকারীকে আটক করা হয়। ছবি : সময়ের আলো টেকনাফসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে আবারও সার পাচারের ঘটনা ঘটেছে। পাচারকালে বিজিবি ও কোস্টগার্ড বেশ কয়েক দফায় সার আটক করেছেন। নতুন করে সার পাচার হওয়ার খবরে সীমান্তের কৃষকসহ সচেতন মহলের মাঝে চরম উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকবছর ধরে মিয়ানমারে সার পাচার অনেকটা বন্ধ ছিল। এমনকি ওই সময়ে সার পাচার ও আটকের ঘটনা ছিল বিরল। তবে, সাম্প্রতিককালে নতুন করে সার পাচারের ঘটনায় কৃষি সংশ্লিষ্টদের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট এলাকায় সার পাচারে জড়িত চোরাকারবারীদের চিহ্নিত করে তাদেরকে কঠোরভাবে দমনের দাবি জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারে সরকার ও বিদ্রোহীদের মাঝে চলমান সংঘাতের কারণে রাখাইন রাজ্যে এক ধরনের সংকট চলছে। আরাকান আর্মি শাসিত ওই রাজ্যের কৃষকরা জমিতে সার প্রয়োগে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
পাচারে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারে ইউরিয়া সারের বেশ কদর রয়েছে। সেখানে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশি মূল্যে ৩ হাজার টাকা ধরে প্রতি বস্তা সার মিয়ানমারের চোরাকারবারীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন এখানকার চোরাকারবারীরা। কৃষকরা জানিয়েছেন, মিয়ানমারে দ্বিগুণ দামে বিক্রির সুযোগে এখানকার চোরাকারবারীরা পাচারে তৎপর রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের হালিশহর, পতেঙ্গা, ভাটিয়ারী, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী কেন্দ্রীক বড় বড় চোরাকারবারীরা সাগরপথে জাহাজ বা ট্রলারে করে মিয়ানমারে সার পাচার করছেন। সমুদ্রপথে সার পাচার করতে গিয়ে কোস্টগার্ডের হাতে একাধিক চালান আটক হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাগরপথে জাহাজে করে সার পাচারের ঘটনার পরপরই টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টের চোরাকারবারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। টেকনাফ-উখিয়ার সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পাচারকালে বিজিবি সারসহ ইতিমেধ্য বেশ কয়েকজন পাচারকারীকে আটক করেছেন।
৮ সেপ্টেম্বর ভোর রাতে টেকনাফের দমদমিয়া সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৫ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করেছেন বিজিবি। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর একই সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৩৫ বস্তা সারসহ একটি হস্তচালিত নৌকা জব্দ করেন বিজিবি। ২০ আগস্ট সাবরাং বিওপির জওয়ানেরা নাফনদীতে অভিযান চালিয়ে ৫৩ বস্তা সারসহ একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা আটক করেন।
এদিকে ৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে ট্রাকে করে পরিবহনের সময় ৩০০ বস্তা সারের একটি বড় চালান জব্দ করেন মরিচ্যা বিজিবি। ৩ সেপ্টেম্বর ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৩৪ বিজিবির জওয়ানেরা ৮৮ বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি সার জব্দ করেন। ১৫ জুলাই রাতে পালংখালী সীমান্ত দিয়ে পচারকালে ১৩ বস্তা ইউরিয়া সারসহ ৪ রোহিঙ্গাকে হাতে নাতে আটক করেন পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা। ১৩ জুলাই পালংখালী সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে ৬৪ বিজিবির অধীনস্থ পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা ১৩০বস্তা সার আটক করেন। ৮ জুলাই পালংখালীর বিওপির জওয়ানেরা আনজুমানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইজিবাইকসহ ২২ বস্তা ইউরিয়া সার আটক করেন। ১ জুলাই পালংখালী বিওপির জওয়ানেরা ফারিরবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২০বস্তা ইউরিয়া সারসহ এক পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করেছে।
এছাড়া চট্টগ্রামের হালিশহর, ভাটিয়ারী, পতেঙ্গা ও কুতুবদিয়া সীমান্ত দিয়ে জাহাজে করে মিয়ানমারে পাচারের সময় সারের বেশ কয়েকটি চালান আটক করে কোস্টগার্ড। (বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, সার পাচারসহ যাবতীয় চোরাচালান রোধে কোস্টগার্ড তৎপর রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাঁশবাড়িয়া ঘাট সংলগ্ন এলাকায় বৃহস্পতিবার রাত ১টায় কোস্টগার্ডের অভিযানে কার্গো বোটে স্থানান্তরকালে প্রায় ২৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ৭০০ বস্তা (৩৫ হাজার কেজি) ইউরিয়া সার ও পাচারকাজে ব্যবহৃত ৩টি ট্রাকসহ দুই পাচারকারীকে আটক করা হয়।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জানান, আগস্ট মাসে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্টিত হয়েছে। ওই সভায় সার পাচাররোধে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, ডিলার পর্যায়ে মনিটরিং বাড়ানো, সারের বস্তার মুখ খোলা দেওয়া, ৫টার পরে সার বিক্রি না করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
তিনি আরও জানান, সার পাচার শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে চেষ্টা অব্যাহত আছে এবং থাকবে। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সার পাচার ঠেকানো সম্ভব জানিয়ে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, দুয়েকদিনের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র্যাবের সমন্বয়ে আরও একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে।
৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল জহিরুল ইসলাম জি জানান, সার এমন একটা জিনিস যা পকেটে করে নেওয়া যায় না। কার সার প্রয়োজন, সেটাও স্থানীয় লোকজন ভালো করেই জানেন। এছাড়া কৃষকসহ স্থানীয়রা সার পাচাররোধে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সময়ের আলো/এনএন