ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে মাত্র ৩৬ ঘণ্টার ব্যবধানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোচা বন্দর ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। অথচ হুথিদের ঠেকাতে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিতে শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা কাজ করছিলেন।
হুথিদের অগ্রযাত্রার আগে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কার কথা বারবার জানিয়েছিলেন ইয়েমেনের জাতিসংঘ-সমর্থিত সরকারের সামরিক কর্মকর্তারা। কিন্তু হামলা শুরুর পর প্রতিরোধ গড়তে যে বিমান সহায়তা চাওয়া হয়েছিল, তা আর আসেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে গালফ নিউজ।
বৃহস্পতিবার সকালে মোচা অভিমুখে হুথিদের বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়। ইয়েমেনের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্রের সহায়তায় কয়েক দফায় যোদ্ধা পাঠায় হুথিরা।
পরিস্থিতির অবনতি হলে ওই কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সৌদি আরবের বিমান সহায়তা আসছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো বিমান সহায়তা আসেনি। একপর্যায়ে মোচা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এর পরদিন পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নেয় হুথিরা। বাব আল-মান্দাব প্রণালির দক্ষিণ প্রবেশমুখে অবস্থিত ছোট এই দ্বীপটি লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছে কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। দ্বীপটি বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে দুটি জলপথে ভাগ করেছে।
হুথিদের অগ্রযাত্রার মধ্যে সৌদি আরব সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেন এবং হুথিদের বিরুদ্ধে হামলার নির্দেশ দিতে তাঁকে অনুরোধ করেন। তবে ট্রাম্প এতে সম্মতি দেননি।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় ওয়াশিংটন কাজ করছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক অংশীদারদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
সিএনএনের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিতে দেশটিতে শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা পাঠানো হয়েছে। এ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক সদস্যের সংখ্যা প্রায় ২০০ বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারও সৌদি আরবে সমন্বয় বৈঠক করেন।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক উপদেষ্টাদের উপস্থিতি হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে পারেনি। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরোধকারী ইয়েমেনি বাহিনীর অভ্যন্তরেও বড় ধরনের দুর্বলতা ছিল। মোচায় ঢোকার পর হুথিরা এমন কিছু সামরিক ইউনিটের মুখোমুখি হয়, যাদের প্রকৃত সদস্যসংখ্যা কাগজে-কলমে দেখানো সংখ্যার তুলনায় অনেক কম।
এক পশ্চিমা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক তালিকায় এমন অনেক ‘ভুয়া’ সদস্যের নাম ছিল, যারা বেতন নিলেও বাস্তবে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। কাগজে থাকা সদস্যদের মাত্র ২০ শতাংশের মতো বাস্তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হুথিবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য ও সমন্বিত নেতৃত্বের অভাবও বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আরব উপদ্বীপের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা বলেছেন, হুথিদের বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য নেই এবং তাদের কোনো সমন্বিত নেতৃত্ব কাঠামোও নেই।
মোচা ও পেরিমের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের জন্য শুধু ইয়েমেনের ভেতরে নয়, আঞ্চলিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে কিছু তেলবাহী জাহাজ লোহিত সাগরমুখী পথে যাওয়ায় এই নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
পেরিমসহ উপকূলীয় আরও কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে হামলা বা নৌযান পাঠানোর সুযোগও বাড়তে পারে। স্যাটেলাইট ছবি ও উন্মুক্ত সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে হুথিদের আরও পূর্বদিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন আল-বাশা।
এ অবস্থায় মোচা ও পেরিমের পতনের পর হুথিদের পরবর্তী লক্ষ্য কী এবং তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক মিত্ররা কী পদক্ষেপ নেয়, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সময়ের আলো/কেএইচ