ইয়েমেনে কয়েক বছর ধরে চলা তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে আবারও তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে হুতি বিদ্রোহী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর মধ্যে। নতুন করে সংঘাত শুরুর এক সপ্তাহেই অন্তত ৪৬ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এতে খাদ্য, আশ্রয়, পানি ও চিকিৎসার সংকটে থাকা বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
তাইজের আল-কাদাহ এলাকায় একটি বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে পাঁচ সন্তান নিয়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আমান মুরশেদ। যুদ্ধ থামার পর একদিন নিজের বাড়িতে ফিরবেন— এমন আশাই ছিল তার। কিন্তু চলতি মাসে আবারও লড়াই শুরু হওয়ায় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
তিন দিন আগে তার আশ্রয় শিবিরের কাছে সংঘর্ষ শুরু হলে সন্তানদের নিয়ে ভোরে পালাতে হয় তাকে। সামনের সারির ওই এলাকায় কোনো গাড়ি না থাকায় দুই কিলোমিটারের বেশি পথ হেঁটে পরে একটি পিকআপে করে নতুন একটি শিবিরে পৌঁছান তিনি।
আমান মুরশেদ বলেন, আগে বাড়ি ফেরার আশা ছিল। এখন আগের শিবিরে ফেলে আসা সামান্য জিনিসপত্র ফিরে পাওয়াটাই তাদের বড় আশা। খাবারও নেই; প্রতিদিন প্রতিবেশীদের দেওয়া এক-দুই বেলার খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
নতুন আশ্রয়স্থল আল-মালিকা শিবিরেও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। প্রতিবেশীদের সহায়তায় কাঠের খুঁটি ও ত্রিপল দিয়ে কোনোভাবে থাকার ব্যবস্থা করছেন তিনি। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে গবাদিপশু ফেলে আসায়। কারণ এগুলোই ছিল তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ও নিরাপত্তার ভরসা।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দফতর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গত সপ্তাহে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
তাইজের আল-মা'ফার জেলার আরেকটি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া আহমেদ আবদুলজলীলও শুক্রবার ভোরে আগের আশ্রয়স্থল ছেড়ে পালিয়েছেন। তার অভিযোগ, নতুন শিবিরে নারীরা ও শিশুরা প্লাস্টিকের চাদরের নিচে রাত কাটাচ্ছেন, আর পুরুষদের খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে হচ্ছে। খাদ্যসংকটও তীব্র।
স্থানীয় একটি বেসরকারি সংগঠনের কর্মকর্তা আবদুলনাসের আল-সুরুরি বলেন, নতুন করে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ায় সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। খাদ্য, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রী প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সবাইকে সহায়তা করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইয়েমেনের জাওফ, মারিব ও আল-বায়দা প্রদেশেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তীব্র লড়াই হয়েছে। ফলে এসব এলাকাতেও নতুন করে বহু মানুষ ঘর ছেড়েছেন। তাইজের বাস্তুচ্যুত শিবির ব্যবস্থাপনা দফতরের কর্মকর্তা আলি কায়েদ জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণে বেশির ভাগ মানুষ আল-মা'ফার এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু শিবিরগুলোর ধারণক্ষমতা এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে।
সংঘর্ষের মধ্যে আহত হয়েছেন মুনির নামের এক ব্যক্তি। জাবাল হাবাশি থেকে পালানোর সময় গুলিতে তার বাঁ পায়ে আঘাত লাগে। চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও এখন লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে তাকে।
মুনির বলেন, বহু বছরের যুদ্ধ তাদের ক্লান্ত করে দিয়েছে। তারা আর কিছু চান না— শুধু যুদ্ধ থেমে যাক এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে বড় ধরনের সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে হুতিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর যুদ্ধ চলছিল। তবে ওই যুদ্ধবিরতির সময়েও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত ছিল।
এদিকে গাজা যুদ্ধের সময় লোহিত সাগরে হুতিদের জাহাজে হামলা এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পাল্টা বিমান হামলার কারণে ইয়েমেনের সংঘাত আন্তর্জাতিক মাত্রা পায়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। এরপর ওই নৌপথের কয়েকটি জাহাজ ও সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে।
তাইজের সাংবাদিক মোহাম্মদ আলি বলেন, গত চার বছরের তুলনামূলক শান্ত সময়ে ইয়েমেনের মানুষ যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশা করেছিলেন। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছিল, সামরিক ফ্রন্টও অনেকটা শান্ত ছিল। কিন্তু বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
তার মতে, যুদ্ধের দুই পক্ষ নিজেদের লক্ষ্য পূরণে এগোলেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে গেলেই নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের ভয়াবহ মানবিক ক্ষতি কতটা গভীর, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ওসিএইচএর ২০২৬ সালের মানবিক চাহিদা অনুযায়ী, ইয়েমেনের প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের মধ্যে ২ কোটি ২৩ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। দেশটিতে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫২ লাখ।
নতুন করে সংঘাত বাড়ায় এসব মানুষের অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলো আবারও আশ্রয়ের খোঁজে পথে নামছে— কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে, কেউ সামান্য কাপড়চোপড় সঙ্গে নিয়ে, আবার কেউ পেছনে ফেলে আসছে নিজের শেষ সম্বলটুকুও।
সময়ের আলো/জেডি