কাঠালিয়ার ওয়ালিউল্লাহর মা-বাবার অন্তহীন অপেক্ষার ১৪ বছর

আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি

সারাদেশ

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেলে ফিরে আসবে—এই আশায় দিন, মাস, বছর পেরিয়ে কেটে গেছে ১৪টি বছর। এখনো সন্তানের ফিরে আসার

2026-09-15T14:51:12+00:00
2026-09-15T14:51:12+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
কাঠালিয়ার ওয়ালিউল্লাহর মা-বাবার অন্তহীন অপেক্ষার ১৪ বছর
আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৫১ পিএম 
ওয়ালিউল্লাহ। ছবি : সংগৃহীত
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেলে ফিরে আসবে—এই আশায় দিন, মাস, বছর পেরিয়ে কেটে গেছে ১৪টি বছর। এখনো সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুণছেন স্নেহময়ী বাবা অধ্যক্ষ মাওলানা ফজলুর রহমান ও মমতাময়ী মা আফিফা রহমান। তারা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রশিবিরের গুম হওয়া নেতা ওয়ালিউল্লাহর বাবা-মা।

বাবা ফজলুর রহমানের আশঙ্কা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া তার ছেলে হয়তো আর বেঁচে নেই এবং কোনো দিন ফিরেও আসবে না। তবুও যদি সে ফিরে আসে, সেই ক্ষীণ আশাতেই বুক বাঁধেন এই বৃদ্ধ দম্পতি।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ওয়ালিউল্লাহর বাড়ি ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামে। তিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে সাভারের নবীনগর এলাকা থেকে ডিবি ও র‌্যাব পরিচয়ে ওয়ালিউল্লাহকে তুলে নেওয়া হয়। তার সঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবির শাখা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল-মুকাদ্দাসকেও তুলে নেওয়া হয়। মুকাদ্দাসের বাড়ি পিরোজপুর জেলার খানা কুনিয়ারী গ্রামে।


সেই থেকে এই দুই নেতার আর কোনো সন্ধান মেলেনি। তারা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সে বিষয়েও কিছু জানে না পরিবার। ছেলেকে হারিয়ে ওয়ালিউল্লাহর বৃদ্ধ বাবা-মা প্রায় পাগলপ্রায়।

ওয়ালিউল্লাহর বাবা মাওলানা ফজলুর রহমান ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার বলতলা কৈখালী সিনিয়র মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ। দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মধ্যে পঞ্চম সন্তান ছিলেন মো. ওয়ালিউল্লাহ। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ওয়ালিউল্লাহ প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের আশায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অনার্স সম্পন্ন করার পর তিনি মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন এবং পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যান ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাস। ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তারা রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে (নম্বর-৩৭৫০) ওঠেন। বাসটি রাত সাড়ে ১১টার দিকে কল্যাণপুর থেকে ছেড়ে রাত ১টার দিকে সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছালে র‌্যাব-৪-এর একটি কালো রঙের মাইক্রোবাস বাসটির গতিরোধ করে। এ সময় র‌্যাবের পোশাকধারী ৮-১০ জন এবং সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি বাসে উঠে র‌্যাব ও ডিবি পরিচয়ে ওয়ালিউল্লাহ ও মুকাদ্দাসকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় ২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মুকাদ্দাসের চাচা আবদুল হাই রাজধানীর দারুস সালাম থানায় এবং ৮ ফেব্রুয়ারি ওয়ালিউল্লাহর বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ আশুলিয়া থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর পরিবার পুলিশ, র‌্যাবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে যোগাযোগ করেও সন্ধান না পেয়ে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন দাখিল করে, যা পরবর্তীতে খারিজ হয়ে যায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত বছরের সেপ্টেম্বরে আল-মুকাদ্দাস ও মো. ওয়ালিউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনা তদন্তে একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল হান্নানকে আহ্বায়ক এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনকে সদস্যসচিব করে এ কমিটি গঠিত হয়।


কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুল হান্নান দুটি সভা করে প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করলেও কমিটির অন্য সদস্যদের অসহযোগিতার অভিযোগ এনে পদত্যাগ করেন। এরপর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কমিটি পুনর্গঠন বা নতুন কোনো উদ্যোগ নেয়নি, ফলে তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে আছে।

ওয়ালিউল্লাহর বড় ভাই খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, এখন এসব নিয়ে কথা বলতে আর ভালো লাগে না। বলতে বলতে ও লিখতে লিখতে আমরা ক্লান্ত। সরকারের কাছে প্রত্যাশা করলেও তো কিছু পাব না। এই ঘটনার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত। সেখানে যারা এখনো কর্মরত, তারা কি তাদেরই বিচার করবে? এ দেশের প্রেক্ষাপটে এটি বিচারযোগ্য নয়। গুম কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তিনি আরও জানান, গত ৩০ আগস্ট গুম দিবসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের সন্ধান ও বিচারের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছে।

ওয়ালিউল্লাহর শোকাহত বাবা মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, প্রতিবারই ঈদ আসে, কিন্তু আমাদের পরিবারে কোনো ঈদের আনন্দ আসে না। সরকারের কাছে তার আকুল আবেদন— তার সন্তান জীবিত থাকলে যেন তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আর মারা গেলে অন্তত তার লাশের সন্ধান যেন দেওয়া হয়। পাশাপাশি এই গুমের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর বিচার দাবি করেছেন তিনি।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলা জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন, সাংগঠনিকভাবে মেধাবী হওয়ায় ক্যাম্পাসকে নেতৃত্বশূন্য ও নিজেদের দখলে নিতেই মো. ওয়ালিউল্লাহকে গুম করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   কাঠালিয়া  ওয়ালিউল্লাহ  মা-বাবা  অপেক্ষা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: