গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট : ঘর থেকে কারখানায় দূর দেশের যুদ্ধের আঁচ

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংকটের প্রভাব এখন আর শুধু আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি চাপ পড়ছে দেশের ঘর-সংসার,

2026-09-18T20:35:38+00:00
2026-09-18T20:45:42+00:00
 
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট : ঘর থেকে কারখানায় দূর দেশের যুদ্ধের আঁচ
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৫ পিএম  আপডেট: ১৮.০৯.২০২৬ ৮:৪৫ পিএম
গ্যাস না পেয়ে ফিলিং স্টেশনে সিএনজি অটোরিকশা চালকদের ভিড়। ছবি : সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংকটের প্রভাব এখন আর শুধু আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি চাপ পড়ছে দেশের ঘর-সংসার, শিল্পকারখানা, রফতানি ও দৈনন্দিন অর্থনীতিতেও। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগায় চাহিদার তুলনায় গ্যাসের জোগান কমেছে। ফলে কোথাও চুলায় আগুন জ্বলছে গভীর রাতে, কোথাও বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার কোথাও থেমে যাচ্ছে উৎপাদন।  

ঢাকার বাসিন্দা পারভিন আক্তারের দিনের হিসাব এখন গ্যাসের চাপের সঙ্গে মেলাতে হয়। এলাকায় কখন গ্যাস আসবে, তার ওপর নির্ভর করছে কখন রান্না হবে। অনেক সময় রাত পেরিয়ে রান্নাঘরে যেতে হচ্ছে তাকে। বিদ্যুৎচালিত ইন্ডাকশন চুলায় যাওয়ার চেষ্টা করেও স্বস্তি মেলেনি। কারণ বিদ্যুৎ চলে গেলে রান্নাও থেমে যায় মাঝপথে। 

এই সংকটের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো। দেশের বিদ্যুতের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে। এতদিন কাতার ছিল এর প্রধান উৎস। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কাতারের সরবরাহ কমেছে। ঘাটতি পূরণে এখন খোলাবাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চলে। তৈরি পোশাক দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত হওয়ায় গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি সরাসরি রফতানি আদেশ ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ধাক্কা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানা ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার বাতিল বা কমে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে ৭৮ শতাংশ কারখানাকে আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানার মালিক আলভি ইসলামের অভিজ্ঞতাও সংকটের গভীরতা দেখায়। গ্যাসের চাপ কমে উৎপাদনের মাঝখানে কারখানার বয়লার নষ্ট হওয়ায় তাকে চীন থেকে কাপড় সংগ্রহ করতে হয়েছে। 

শুধু অর্ডার কমে যাওয়াই নয়, সময়মতো পণ্য পাঠাতে বাড়তি খরচও করতে হচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন পিছিয়ে যাওয়ায় একটি পোশাক কারখানাকে ফ্রান্সের ক্রেতার কাছে হুডি জ্যাকেট পাঠাতে বিমানভাড়া বাবদ ৫০ হাজার ডলার ব্যয় করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান। উৎপাদন সচল রাখতে অতিরিক্ত ডিজেলও কিনতে হয়েছে তার প্রতিষ্ঠানকে। 

এ সংকট শিল্পখাত পেরিয়ে এখন কৃষি ও গৃহস্থালিতেও । টাঙ্গাইলের পোলট্রি খামারি সৈয়দুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় শেডের বৈদ্যুতিক পাখা চালানো যাচ্ছে না। অতিরিক্ত গরমে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি মুরগি মারা যাচ্ছে তার খামারে।   

স্বাস্থ্যসেবাতেও এর প্রভাব পড়ছে। সিলেটের একটি হাসপাতালে প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। জেনারেটরের মাধ্যমে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালু রাখা গেলেও সব ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। গরম ও ভিড়ের মধ্যে রোগীদের বাড়ছে দুর্ভোগ। 

এ অবস্থায় সরকার সংকট সামাল দিতে খুঁজছে বিকল্প ব্যবস্থা। জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং এলএনজির নতুন উৎস খোঁজার পাশাপাশি একটি অচল এলএনজি টার্মিনাল সচল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এটি কার্যকর হলে আরও বেশি এলএনজি খালাস করা সম্ভব হবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহে সামান্য উন্নতির কথাও জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। 

তবে সমস্যাটি শুধু তাৎক্ষণিক সরবরাহ ঘাটতির নয়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এলএনজির দাম বাড়ছে দ্রুত। এশিয়ার স্পট বাজারে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের দাম চলতি সপ্তাহে পৌঁছেছে প্রায় ৩০ ডলারের কাছাকাছি; যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল প্রায় ১০ ডলার। শেলের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চলতি বছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ হারিয়েছে বিশ্ববাজার।


দেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতার মাত্রা বেশি এবং কাতারনির্ভরতা দীর্ঘদিন ধরেই বড়। ফলে হরমুজ বা লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত দেশের ভেতরে এসে পড়ে। 

বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের পাশাপাশি এর চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের ওপরও। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্যের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তার ওপরই গিয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে একসঙ্গে দুটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে— তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে আমদানির ঝুঁকি কমানো। বিকল্প দেশ থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর আলোচনা তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

হরমুজ প্রণালির যুদ্ধ কবে থামবে, তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু দেশের জন্য সংকেতটি স্পষ্ট— দূরদেশের যুদ্ধও এখন রান্নাঘরের চুলা থেকে পোশাক কারখানার বয়লার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। জ্বালানি সরবরাহের একটি পথ বন্ধ হলেই যাতে পুরো অর্থনীতি নড়বড়ে না হয়ে পড়ে, সেই সক্ষমতা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   গ্যাস  বিদ্যুত  চাপ  যুদ্ধ 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: