নীল নদের তীরে সুদানের আবু হামাদ একসময় ছিল সবুজে ঘেরা কৃষিনির্ভর জনপদ। শহরের বাগান ও কৃষিজমিতে খেজুর, কমলালেবুসহ নানা ধরনের ফল এবং শীতকালীন ফসল চাষ হতো। এসব কৃষিপণ্য পূর্ব সুদানের বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি রাজধানী খার্তুম ও পোর্ট সুদানেও সরবরাহ করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকটে ক্ষুদ্র পরিসরের স্বর্ণ খনির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। স্বর্ণ আহরণের এই তৎপরতায় বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ায় মাটি, পানি, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবু হামাদ শহরের অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কৃষিজমি পরিষ্কার করে সেখানে তৈরি হয়েছে দোকান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা। শহর ও আশপাশের এলাকায় এখন সাত শতাধিক বর্জ্যের স্তূপ রয়েছে। এসব বর্জ্য থেকে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে মাটি, পানি ও বাতাসে।
আবু হামাদে ক্ষুদ্র পরিসরে স্বর্ণ উত্তোলন শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। তবে, গত ৬ বছরে এই কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে সুদানের মোট স্বর্ণ উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে ক্ষুদ্র খনি থেকে। ফলে, আবু হামাদ এখন দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণ উত্তোলন ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
স্বর্ণ প্রক্রিয়াজাত করার পর যে বর্জ্য বা টেইলিংস পড়ে থাকে, তাতেও প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত স্বর্ণ থাকতে পারে। অবশিষ্ট স্বর্ণ বের করতে সায়ানাইড, পারদ ও থায়োইউরিয়ার মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। বৃষ্টির পানি ও বন্যার স্রোতের সঙ্গে এসব রাসায়নিক কৃষিজমিতে পৌঁছে যাচ্ছে। এর ফলে মাটির লবণাক্ততা বাড়ছে এবং কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
কৃষক মোহাম্মদ ফাথি আল-রহমান আল-খলিফা জানান, কয়েক বছর আগে একটি ফলন মৌসুমে তার জমি থেকে প্রায় ৪ ট্রাক কমলা পাওয়া যেত। এখন সেই জমি থেকে আধা ট্রাকেরও কম কমলা পাওয়া যায়। একইভাবে গমের উৎপাদন একরপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ বস্তা থেকে কমে ১২ থেকে ১৮ বস্তায় নেমে এসেছে। ফাভা বিনের উৎপাদনও প্রায় এক একরে ৪০-৫০ বস্তা থেকে কমে মাত্র ৩-৪ বস্তায় দাঁড়িয়েছে।
আল-খলিফার মতে, পরিস্থিতি এখন শুধু স্থানীয় কৃষকদের সমস্যা নয়। খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় এটি ধীরে ধীরে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সংকটে রূপ নিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শহরেও সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম বাড়ছে।
খনি কার্যক্রমের প্রভাব পড়েছে পশুপালনের ওপরও। পশুপালক আবু আল-কাসিম আল-খাজিন জানান, কিছু পশু লোম ছাড়াই জন্ম নিচ্ছে, আবার কোনো কোনো পশুর চোখও নেই। কিছু পশুর আচরণেও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। ২০২২ সালে পানির নমুনা পরীক্ষা করে ২০ শতাংশের বেশি পারদের উপস্থিতি পাওয়া যায়। স্থানীয় এক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, গর্ভপাত এবং ভ্রূণের জন্মগত ত্রুটির ঘটনা বাড়ছে। আগে যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা খুব কম দেখা যেত, এখন সেগুলো প্রায় প্রতিদিনই নজরে আসছে বলে তিনি জানান।
আবু হামাদের একটি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রেও রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রটি প্রায় ১০০ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে, যদিও এর প্রাথমিক সক্ষমতা এত বেশি রোগীর জন্য ছিল না।
বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুবছর আগে বন্যার সময় খনি থেকে বের হওয়া বর্জ্য ও টেইলিংস আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। প্রকৌশলী ও পরিবেশকর্মী হাশেম আবদেল আজিম আল-মাহি জানান, ২০১৭ সালে সুদানে থায়োইউরিয়াকে স্বর্ণ উত্তোলনে তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে চালু করা হয়েছিল। তবে, বাস্তবে এর ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়ে গেছে।
আবদেল আজিমের মতে, সুদানে স্বর্ণ উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে, ক্ষতিকর পদ্ধতিগুলো বন্ধ করে খাতটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
স্বর্ণ খনির বিস্তার শুধু পরিবেশ ও অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলছে না, বদলে দিচ্ছে স্থানীয় সামাজিক কাঠামোও। দারিদ্র্যের কারণে অনেক তরুণ পড়াশোনা ছেড়ে খনিতে কাজ করতে যাচ্ছে। ঘারিয়ার নর্দার্ন বয়েজ স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আহমেদ আবদেল আজিজ জানান, তার স্কুলের প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৫ থেকে কমে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়েও শিক্ষার্থীর সংখ্যা একইভাবে কমেছে।
খনিতে কাজ করে দ্রুত অর্থ উপার্জন এবং গাড়ি কেনা তরুণদের দেখে অনেক শিক্ষার্থীও পড়াশোনার বদলে একই পথে যেতে আগ্রহী হচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে ভবিষ্যতে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও অধ্যাপকের মতো পেশাজীবীর ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফের মধ্যে সংঘাত চলছে। সুদান ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড পলিসি ট্র্যাকার-এর সুলেইমান বালদোর মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংঘাতের দুই পক্ষই স্বর্ণের খনি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
ফলে, নীল নদের তীরের একসময়ের কৃষিনির্ভর আবু হামাদ এখন স্বর্ণের অর্থনীতির ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কিন্তু সেই অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমি, পানি, পশুপালন, জনস্বাস্থ্য এবং শিক্ষাব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা সুদানের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
সময়ের আলো/মহু