জীবন মানেই সুখ-দুঃখ, আনন্দ-কষ্ট, আশা-হতাশার একত্রিত রূপ। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে কুরআনে বলছেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি’ (সুরা জারিয়াত : ৫৬)।
আয়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনামতে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। ইবাদত বলতে কেবল বাহ্যিক সালাত, রোজা, সাওম, জাকাত ইত্যাদি উদ্দেশ্য নয়; বরং মানবজীবনের সার্বিক দিক ইবাদতের আওতাধীন। সুখ ও আনন্দের আতিশয্যে মহান আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য স্বীকার এবং দুঃখ ও কষ্টের তীব্রতায় ধৈর্যধারণ করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আমরা দুঃখ-কষ্টকে নিজের জীবনের জন্য অভিশাপতুল্য মনে করি।
প্রকৃতপক্ষে পার্থিব দুঃখ, কষ্ট ও হতাশাগুলো আল্লাহ তায়ালার পরীক্ষা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, ‘যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন কে আমলের দিক থেকে উত্তম’ (সুরা মুলক : ২)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও’ (সুরা বাকারা : ১৫৫)।আয়াতগুলো দ্বারা এ কথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে, পার্থিব দুঃখ-কষ্ট বান্দার ওপর কোনো আজাব নয়; বরং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ হতে পারে।
আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা : আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করে তাকে পরীক্ষা করার জন্য বিভিন্ন বিপদাপদ দিয়ে থাকেন। এ অবস্থায় অস্থির না হয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করাই একজন মুমিনদের কাজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক : ৩)
আল্লাহভীতি অন্তরে জাগিয়ে তোলা : দুঃখ-কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহভীতি হৃদয়ে জাগিয়ে তুলতে হবে। প্রতিটি কাজকর্মে আল্লাহকে ভয় করে চলতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে), আল্লাহ তার জন্য সংকটের মধ্য থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন।’ (সুরা তালাক : ২)
ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করা : মানুষ সৃষ্টির একমাত্র কারণই আল্লাহর ইবাদত করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। মানবজীবনের সব প্রতিকূল অবস্থা থেকে সালাত ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সাহায্য কামনা করতে হবে। তা হলেই কেবল দুঃখ-কষ্টের অবসান ঘটে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা : ১৫৩)
কুরআন তেলাওয়াত ও ইসতিগফার পাঠ : সব ধরনের জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে পরিত্রাণ লাভের আরেকটি মাধ্যম হলো অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত ও জিকির করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর জিকির (স্মরণ) দ্বারাই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়’ (সুরা রাদ : ২৮)। বেশি বেশি ইসতিগফার বা ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ পড়লে আল্লাহ সব রকম বিপদাপদ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ সুগম করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইসতিগফার করবে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাবেন এবং সব দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেবেন।’ (আবু দাউদ)
তকদিরের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা : সুখ-দুঃখ, হতাশা, শান্তি সবকিছু মহান আল্লাহর পরীক্ষা এবং তাঁর পক্ষ থেকে নির্ধারিত— এ কথার ওপর পূর্ণ ঈমান রাখলে অন্তর প্রশান্ত থাকে। সুখ-দুঃখ যাই আসুক না কেন, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত— এই বিশ্বাস মনে রাখলে দুঃখের তীব্রতা কমে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের ওপর যে মসিবতই আসুক না কেন, তা সৃষ্টির আগেই একটি কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) লিপিবদ্ধ আছে।’ (সুরা হাদিদ : ২২)
লেখক : শিক্ষিকা, আল হেরা মডেল একাডেমি, কিশোরগঞ্জ
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে/এমকে