গাইবান্ধার দুটি উপজেলায় প্রায় একই সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় জলাতঙ্ক ও অ্যানথ্রাক্সের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাদুল্লাপুরে কুকুরের কামড়ে শিশুর মৃত্যু, সুন্দরগঞ্জে শিয়ালের কামড়ে নারী-শিশুসহ নয়জন আহত এবং অসুস্থ গরুর মাংস কাটতে গিয়ে একদল মানুষের শরীরে সন্দেহজনক ফোসকা দেখা দেওয়ার ঘটনা ঘটনায় মাঠে নেমেছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের রোগতত্ত্ব-এপিডেমিওলজি বিভাগের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ দল।
গাইবান্ধার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জোবাইদুল কবীর জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আক্রান্ত তিনটি এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে প্রাদুর্ভাবের উৎস ও কারণ অনুসন্ধানে নমুনা ও তথ্য সংগ্রহ করেছে ঢাকা ও রংপুরের সমন্বয়ে গঠিত চার সদস্যের এই দল। দলের আহ্বায়ক রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দফতরের ডেপুটি চিফ এপিডেমিওলজিস্ট ডা. রফিকুল আলম। অন্য সদস্যরা হলেন ঢাকার ভাইরোলজি অনুবিভাগের ডা. সাজেদুল হায়াত, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের এপিডেমিওলজি বিভাগের ডা. কামরুন্নাহার আকতার এবং স্ট্রাইডস বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি। তিনি জানান, সুন্দরগঞ্জের শিয়ালের মাথা ও সাদুল্লাপুরের কুকুরের নমুনা জলাতঙ্ক নিশ্চিতকরণের জন্য ইতোমধ্যে ঢাকার সিডিআইএলে (সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরি) পাঠানো হয়েছে এবং আক্রান্তদের মধ্যে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দেয় কি না, তা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাদুল্লাপুর উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের হাটবামুনী গ্রামে প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফেরার পথে একটি কুকুরের তাড়া খায় সাত বছর বয়সী সিনথিয়া আক্তার। এক পর্যায়ে কুকুরটি তার গলায় কামড় দিলে শ্বাসনালীতে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সাদুল্লাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তানভীর জাহান জানান, কুকুরটিকে পরে মেরে ফেলা হয় এবং জলাতঙ্ক শনাক্তে মাটিতে পুঁতে রাখা কুকুরটির নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এর একদিন আগে, ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের জিগাবাড়ী ও তালুক বেলকা গ্রামে তাণ্ডব চালায় একটি শিয়াল। পথচারী ও বাড়ির আশপাশে থাকা চার শিশুসহ নয়জনের মুখ, ঠোঁট, কপাল ও হাতে কামড় বসায় প্রাণীটি। আহতদের মধ্যে রয়েছেন রাবেয়া বেগম, তার ছেলে রাকিবুল হাসান, এনামুল হক, আয়শা আক্তার, হাসান মিয়া, লিলি বেগম, সাদেক হোসেন, আফরুজা বেগম ও শাওন মিয়া। স্থানীয় বাসিন্দা ইসমোতারা বেগম জানান, প্রতিবেশী সাদেক হোসেনকে বাঁচাতে গিয়ে লিলি বেগমের কপালের মাংস ছিঁড়ে নেয় শিয়ালটি। একই শিয়ালের আক্রমণে দুটি গরুও আহত হয়েছে। পরে স্থানীয়রা শিয়ালটিকে পিটিয়ে হত্যা করেন এবং আহতদের সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এসবের বাইরে গত ১১ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জের পূর্ব বাছহাটি গ্রামে মঞ্জুরুল ইসলাম নামে ব্যক্তির অসুস্থ একটি ফ্রিজিয়ান গাভী জবাই করে মাংস কাটায় অংশ নেন বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। কয়েকদিনের মধ্যে প্রথমে চারজন এবং পরে অন্তত ১০-১৫ জনের শরীরে ফোসকা দেখা দেয়, যা পরীক্ষায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ বলে শনাক্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রওজাতুন জান্নাত বলেন, সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রধানদের নিয়ে তিনি আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং উপজেলার সব কুকুরকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন মজুত রয়েছে জানিয়ে তিনি সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় একটি পাগলা কুকুরের কামড়ে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও ৬ থেকে ১৩ মে-র মধ্যে মাত্র এক সপ্তাহে তিন নারী ও দুই পুরুষসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনায় নারী-শিশুসহ আরও ২১ জন আহত হন। সেদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ডের কঞ্চিবাড়ি, বজরা কঞ্চিবাড়ি, সতীরজানসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে তাণ্ডব চালিয়েছিল কুকুরটি।
সময়ের আলো/এনএন