পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ডাকা মিছিলকে কেন্দ্র করে রাজধানী ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করেছে সরকার। বুধবার রাজধানীতে প্রবেশের প্রধান পথগুলোয় পণ্যবাহী কনটেইনার দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। ইমরান খানের সমর্থকদের ঠেকাতে কার্যত লকডাউন করে ফেলা হয়েছে রাজধানী। মোতায়েন করা হয়েছে কয়েক হাজার অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। আগামী রোববার এই মিছিল হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত কয়েক দিনে ইমরান খানের তিন বোনসহ দলের শত শত কর্মীকে আটক করেছে কর্তৃপক্ষ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইমরানের দল ও সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের কারণে পাকিস্তানে বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। দুই বছর আগে পিটিআইয়ের বড় একটি বিক্ষোভ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং এতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ইসলামাবাদে বাড়তি নিরাপত্তা
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, রাজধানী ও এর আশপাশে প্রায় ৩৫ হাজার অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি এ তথ্য জানান। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও সম্ভাব্য বিক্ষোভস্থলগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে ইসলামাবাদকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করা দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ। ওই প্রদেশে ইমরানের দল ক্ষমতায় রয়েছে।
রাজধানীর সরকারি এলাকা ঘিরেও ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। ওই এলাকায় পাকিস্তানের পার্লামেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাস রয়েছে।
সহিংসতা হলে কঠোর ব্যবস্থা
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান সাবেক ক্রিকেট তারকা। ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারান তিনি। ২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের পর থেকে কারাগারে রয়েছেন ইমরান। তিনি নিজেকে ‘রাজনৈতিক বন্দি’ বলে দাবি করে আসছেন। তবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তার এই দাবি অস্বীকার করেছে।
ইমরান প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকাকালে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তার গ্রেপ্তারের পর পাকিস্তানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। বিক্ষোভকারীরা সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনাতেও হামলা চালায়।
সোমবার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি সতর্ক করে বলেন, মিছিল সহিংস হয়ে উঠলে পুলিশকে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্য, কেউ এসে গুলি চালালেও পুলিশ নীরব থাকবে, এমন পরিস্থিতি হতে দেওয়া হবে না।
মিছিল অব্যাহত রাখার ঘোষণা পিটিআইয়ের
সরকারের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সড়ক অবরোধের মধ্যেও মিছিল করার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়েছে পিটিআই। দলের চেয়ারম্যান গওহর খান জানিয়েছেন, বাধা সত্ত্বেও কর্মসূচি চলবে।
এই বিক্ষোভ এমন সময়ে হচ্ছে, যখন ইমরানের চিকিৎসা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। এক মাসেরও বেশি আগে একটি আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সরকার তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেয়নি বলে অভিযোগ করেছে তার দল। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। এই অসন্তোষ শুধু ইমরানের সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজধানীর এক শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আসাদ উল আসাফ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত। তার অভিযোগ, সরকার মানুষের মধ্যে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে।
বেকার প্রকৌশলী মুহাম্মদ জিশান বলেন, ইসলামাবাদে চলাচলে বিধিনিষেধ সাধারণ মানুষের ওপর আরও চাপ তৈরি করছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষের যাতায়াতেও সমস্যা হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতিও প্রতিদিন বাড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইমরান খানের ২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে যে সহিংসতা হয়েছিল, তা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উপহারসংক্রান্ত মামলা, সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় হামলায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ এবং বেআইনি বিয়েসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ