কুড়িগ্রাম জেলায় সার সংকট নিয়ে বিতর্ক কাটছেই না। কৃষি বিভাগ সংকট নেই দাবি করলেও বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা যায়। এর মধ্যে ডিলারের গুদাম থেকে সার লুট, রাস্তা অবরোধ, ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তার ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষ করে সার বিতরণে তদারকি কাজে নিয়োজিত কৃষি কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের তোপের মুখে পড়ছেন। এর মধ্যে একজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও দুজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কৃষকদের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে অবরুদ্ধ হয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। এসব ঘটনায় কৃষকদের নামে মামলাও করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই কৃষক কারাভোগ করেছেন। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অর্ধশতাধিক কৃষক। ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে সরকারি দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরিন।
কৃষকদের অভিযোগ, দিনের পর দিন ডিলার পয়েন্টে সার না পেলেও উচ্চমূল্যে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার পাওয়া যাচ্ছে। এতে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে তাদের ধারণা। এর মধ্যে ভূরুঙ্গামারী, রৌমারী, উলিপুর ও রাজীবপুরে ডিলারের গুদাম থেকে সার লুটের ঘটনায় চাপে পড়েছে কৃষি বিভাগ। সংকট মোকাবিলায় এক হাজার টন সার বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
এর মধ্যে রোববার কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নে সার বিতরণকালে হামলার শিকার হন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস) মামুন অর রশিদ। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় তার সহকর্মীরা এক হয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এরপর সোমবার সদর থানায় একটি অভিযোগ করা হয়।
মামুন অর রশিদ বলেন, কৃষকদের সহযোগিতা করতে গিয়ে কৃষি কর্মকর্তা আক্রমণের শিকার হয়েছেন, এটি কাম্য ছিল না। অভিযোগে চারজনের নামের পাশাপাশি অজ্ঞাত ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। এ ঘটনায় কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসি কামাল হোসেন বলেন, এজাহার নয় কৃষি বিভাগের একটি অফিস ফরোয়াডিং পেয়েছেন তারা। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সবশেষ মঙ্গলবার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুর বাজারে সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধের কারণে কুড়িগ্রাম-চিলমারী আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং সার বিতরণ শুরু করেন।
এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর ভূরুঙ্গামারীর বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নে সার বিতরণের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুল আলমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনায় ভূরঙ্গামারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বাদী হয়ে ১১ জনের নামের পাশাপাশি অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।
এ মামলায় কৃষক আল আমিন (৪৭) ও সুরুজ মিয়াকে (৪৫) গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তারা আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন। বাকি আসামিরা পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে সুরুজ মিয়ার দাবি, তারা সারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন, কোনো কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলেননি। ওই ঘটনার পর ১৮ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নের গাবতলা বাজারে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সার না পেয়ে কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে গুদামে অবরুদ্ধ করে রাখেন কৃষকরা। সেই সঙ্গে মাদারগঞ্জ-ভূরুঙ্গামারী সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করেন তারা। পরে চার ঘণ্টা পর নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশি নিরাপত্তায় কৃষি কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান।
একই দিন সন্ধ্যায় উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের গাবতলি বাজারে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমার একজন খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে ঘেরাও করেন জনতা। তাকে একটি দোকানে আধাঘণ্টা আটকে রেখে বিক্ষোভ করেন তারা। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
কৃষি বিভাগ বলছে, এসব ঘটনায় কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কৃষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈরী সম্পর্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার ব্যবস্থাপনায়।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরিন বলেন, ভয় আর আতঙ্গ নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও এ ব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। যারা দোষী নন, তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
সার বিতর্কে কৃষি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তার চেয়ার বদল : কুড়িগ্রামে সার বিতরণে একের পর এক বিশৃঙ্খলা ও কৃষক ভোগান্তির মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বদলি করা হয়েছে। তাকে ঝিনাইদহ জেলার বীজ প্রত্যয়ন অফিসার হিসেবে বদলি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। বুধবার বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাকে ঝিনাইদহ বদলি করা হয়েছে। আমি দায়িত্ব হস্তান্তর করেছি। কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সোমবার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কামরুল ইসলাম খান স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আদেশের অনুলিপি কুড়িগ্রামে পৌঁছায়।
জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, জেলায় সার বিতরণে একের পর এক বিশৃঙ্খলা ও কৃষক ভোগান্তির কারণে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে শাস্তিমূলকভাবে বদলি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল্লাহ আল মামুনকে স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ দেওয়া হয়েছে। তাকে বুধবার বিকালের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থল ঝিনাইদহে যোগ দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য করা হবে।
তার স্থলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের খামারবাড়ী, ঢাকার প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ মো. রওশন কবীরকে কুড়িগ্রামের উপপরিচালক হিসেবে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে।
খামারবাড়ী কুড়িগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল্লাহ আল মামুন অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ) তানভীর আহমেদ সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে মঙ্গলবার কুড়িগ্রাম ত্যাগ করেছেন।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, কৃষি বিভাগের উপপরিচালকের বদলি হয়েছে। বুধবার নতুন উপপরিচালক পদে একজন কর্মকর্তা যোগদান করবেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে