বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের কলমযোদ্ধা আখতার হুসেন মারা গেছেন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে পান্থ হুসেন ও প্রমিত হুসেনকে রেখে গেছেন।
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ নানা শারীরিক জটিলতা নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন আখতার হুসেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্যানসারেও ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চার দিন আগে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার তেজকুনীপাড়ায় তাঁদের বাসার কাছে রেলওয়ে কলোনি জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে।
সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আখতার হুসেনের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে রাখা হবে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নেওয়া হবে তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। সেখানে স্ত্রী মল্লিকা হুসেনের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন তিনি। ছড়া, শিশুসাহিত্য, জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদনাসহ তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও তার।
তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ এবং ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’।
মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আখতার হুসেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/আজ রুখবে তাদের কারা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। সুরকার অজিত রায়ের সুরে গানটি গেয়েছিলেন শিল্পী তিমির নন্দী।
পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতাও করেছেন তিনি। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন আখতার হুসেন।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষা শহিদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলোও ছিলেন।
শিশু-কিশোরদের জন্য তার দীর্ঘ সাহিত্যকর্ম এবং মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন আখতার হুসেন।
সময়ের আলো/জেডি