ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। বঙ্গোপসাগরের ঢেউ পেরিয়ে একে একে মাছ ধরার ট্রলার ভিড়ছে নোয়াখালীর হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাটে। জেলেদের ব্যস্ততা, আড়তদারদের হাঁকডাক আর মাছ নামানোর কর্মযজ্ঞে মুখর ঘাট। এরই মধ্যে একটি ট্রলার ঘাটে ভিড়তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ট্রলারটির পাটাতনজুড়ে থরে থরে সাজানো রুপালি ইলিশ। চোখে পড়ার মতো বড় একটি চালান দেখে ঘাটে জড়ো হন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে হাতিয়ার জেলে আব্দুর রহিম মাঝির ওই ট্রলারটি বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৬০ মণ ইলিশ নিয়ে চেয়ারম্যান ঘাটে ফেরে। পরে মাছগুলো নেওয়া হয় সাইফুল মৎস্য আড়তে। সেখানে দুপুর পর্যন্ত তিন ধাপে নিলামে মাছগুলো বিক্রি হয় প্রায় ২০ লাখ টাকায়।
একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ ইলিশ পাওয়ায় ঘাটে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। দীর্ঘ ছয় দিন সাগরে অবস্থানের পর কাঙ্ক্ষিত মাছ নিয়ে ফেরায় জেলেদের মুখেও ছিল স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ।
জানা গেছে, আব্দুর রহিম মাঝি ১৮ জন মাঝি-মাল্লা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। টানা ছয় দিন সাগরে অবস্থান করে বিভিন্ন এলাকায় জাল ফেলেন তারা। সাগরের বৈরী পরিবেশ, দীর্ঘ সময়ের শ্রম ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলতে থাকে মাছ ধরার চেষ্টা।
অবশেষে জালে ধরা পড়ে বিপুল পরিমাণ ইলিশ। মাছের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে ট্রলারটি ঘাটে পৌঁছানোর পরপরই সেটিকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়। মাছ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা নিলামে অংশ নিতে শুরু করেন। প্রতিযোগিতামূলক দর হাঁকানোর মধ্য দিয়ে বিক্রি হয় প্রায় ৬০ মণ ইলিশ। সব মিলিয়ে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২০ লাখ টাকা।
সাগরে মাছ পাওয়ার ওপরই হাতিয়ার বহু জেলে পরিবারের আয়-রোজগার নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতিবার সাগরে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যায় না। জ্বালানি, খাবার, বরফসহ নানা খরচ করে সাগরে যাওয়ার পর খালি হাতে ফিরলে লোকসানের মুখে পড়তে হয় তাদের। ফলে একটি ট্রলারে এত মাছ পাওয়া জেলেদের কাছে বড় স্বস্তির খবর।
ট্রলারের মাঝি আব্দুর রহিম বলেন, সাগরে ছয় দিন থাকার পর এত ইলিশ একসঙ্গে পেয়েছি। মাছ ভালো পাওয়ায় আমরা সবাই খুব খুশি। দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার খরচ ও শ্রমের পর ভালো পরিমাণ মাছ পাওয়ায় জেলেদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। সামনে আরও ভালো মাছ পাওয়ার আশা করছি।
সাইফুল মৎস্য আড়তের মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, সকালে ট্রলারটি ঘাটে আসার পর বিপুল পরিমাণ ইলিশ দেখে সবাই খুশি হয়েছে। মাছগুলো তিন ধাপে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। প্রায় ৬০ মণ ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২০ লাখ টাকার মতো। মৌসুমে একসঙ্গে এত মাছ আসায় ব্যবসায়ীরাও আশাবাদী।
চেয়ারম্যান ঘাটের ব্যবসায়ী মো. আকবর হোসেন বলেন, একসঙ্গে এত ইলিশ আসায় ঘাটে বেশ প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ভালো পরিমাণ মাছ পাওয়ায় জেলেদের পাশাপাশি আড়তদার ও ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হবেন। সাগরে ইলিশের এমন উপস্থিতি অব্যাহত থাকলে মাছের সরবরাহ বাড়বে এবং ব্যবসায়ও গতি আসবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, এই সময়ে বঙ্গোপসাগরে ইলিশের প্রাপ্যতা ভালো থাকায় জেলেরা আশানুরূপ মাছ পাচ্ছেন। একটি ট্রলারে প্রায় ৬০ মণ ইলিশ পাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই আনন্দের। তবে ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন বাড়াতে সরকারি নির্দেশনা মেনে মাছ ধরার পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণ ও নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
সময়ের আলো/জোই