জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর মাশুল এখন দিতে হচ্ছে দেশের ভোক্তা-সাধারণকে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। আর সেই পরিবহন ব্যয়ের বাড়তি খরচ চেপেছে ভোক্তার ঘাড়ে। কারণ বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সবজির বাজারে তো রীতিমতো টালমাটাল অবস্থা।
বেগুনের কেজি ঠেকেছে ১৫০ থেকে ১৬০, শিমের কেজি ২০০-এর ওপরে, টমেটোর কেজি ১০০ থেকে ১২০ ও কাঁচামরিচের কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। এভাবে বাজারের অধিকাংশ সবজির দামই বেড়েছে কেজিতে নিম্নে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ টাকা পর্যন্ত।
শুধু যে সবজির বাজার বেসামাল তা নয়— বাজারে মাছ-মাংস থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল ও চিনি জাতীয় পণ্যের দামও বেড়েছে। তা ছাড়া আটা-ময়দার পাশাপাশি দাম বেড়েছে সব ব্র্যান্ডের তরল দুধেরও। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির এক সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ নিত্যপণ্যেরই দাম বেড়েছে। আর সব ধরনের পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে পড়বে না; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল বাজারে ঠিকই সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাজারে কঠোর মনিটরিং চালু করা দরকার বলে মত তাদের। শুক্রবার রাজধানীর কল্যাণপুর নতুন বাজার, শেওড়াপাড়া বাজার ও কারওয়ান বাজারসহ আরও কয়েকটি বাজার ঘুরে সবজি, মাছ, মাংস, দুধ, ফল, আটা-ময়দা, চাল, তেল ও ডিমের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগেও নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এখন বাড়তি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সেই চাপ আরও বাড়ছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫, পেট্রোল ১৬০, অকটেন ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। এর দুদিনের মধ্যে সারা দেশে বাস ও লঞ্চভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক বা পিকআপের ভাড়াও বেড়ে গেছে অঘোষিতভাবে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০-২০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৬০-১৮০ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে শিমের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা বেড়েছে। টমেটোর দাম ৮০-১০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০০-১২০ টাকা। দেশি শসা ৫০-৬০ থেকে বেড়ে ৮০ ও করলা ৬০ থেকে বেড়ে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুনের দামও ৮০-১০০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০-১৬০ টাকায়। এ ছাড়া প্রতি পিস লাউ ৭০-৮০, কচুরলতি কেজি ৮০ ও গাজর ১২০-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে পটোলের দাম কেজিতে ৫০ থেকে বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। ধুন্দলের দাম ১০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০-৮০ টাকায়। বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা কেজি এবং ঝিঙার দাম ৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০ টাকা। বেড়েছে কাঁচামরিচের দামও। গত সপ্তাহে কেজিপ্রতি ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল কারওয়ান বাজারে তা ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে পেঁয়াজ ৪৫, দেশি রসুন ১২০, ভারতীয় রসুন ১৮০ এবং আদা ১৪০ টাকা কেজি।
রাজধানীর কল্যাণপুর নতুন বাজারের সবজি বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, সাভার-মানিকগঞ্জ থেকে সবজি আনতে পিকআপ ভাড়া আগের চেয়ে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এই টাকা তো আর আমরা নিজেদের পকেট থেকে দেব না। স্বাভাবিকভাবেই এই টাকা সবজি বিক্রি করেই তুলতে হচ্ছে। অর্থাৎ পরিবহনের জন্য বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ছে। মূলত পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সব ধরনের সবজির দাম বেড়ে গেছে।
মুরগির সরবরাহ কম, পরিবহনে বাড়তি ভাড়া : সবজির পাশাপাশি মাছ-মুরগির বাজারেও বাড়তি দাম দেখা যাচ্ছে। হাতিরপুল বাজারে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকা কেজি দরে। ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা কেজি দরে। হাতিরপুল কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী শাহীন অভিযোগ করে বলেন, ‘মুরগির উৎপাদন কম, খরচ বেশি। কাপ্তান বাজারে মুরগি আসে, সেখান থেকে পিকআপে করে নিয়ে আসি। গাড়িভাড়া বাড়ছে, তাই আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হয়।’
মুরগির সরবরাহ কমে গেছে জানিয়ে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী সুমন বেপারি বলেন, ‘এক হাজার মুরগি চাইলে ৩০০ দিচ্ছে।’
দামের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজকে প্রতি মুরগিতে ৪ টাকা বেশি পড়েছে।’ রাজধানীর একেক এলাকায় একেক দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম। অধিকাংশ বাজারেই ডিমের দাম গত সপ্তাহে ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। তবে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির পর তা প্রতি ডজনে ১০ টাকা বেড়ে গেছে।
তবে গরু ও খাসির মাংসের দামে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের দামেই গরুর মাংস ৮০০ এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মুরগির মতোই মাছের দামও ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে ইলিশের দাম আকারভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। দাম বেড়ে দুই কেজি ওজনের রুই মাছ ৩৮০ থেকে ৪০০, বড় রুই ৪৫০, মাঝারি কাতল ৪০০ এবং বড় কাতল ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় তেলাপিয়া ২৮০, ছোট তেলাপিয়া ২৪০ এবং পাঙাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। চাষের চিংড়ি আকারভেদে ৭০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ বাড়ায় পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে।
বেড়েছে আটা-ময়দার দাম : টিসিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে প্যাকেটজাত আটার দাম ৪ শতাংশ ও ময়দার দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায় এবং ময়দা ৮০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সপ্তাহখানেক আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলেন, গত মাসেই আটা-ময়দার দাম কেজিতে ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির ফলে আবার মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছেন ডিলাররা।ট্রাকভাড়া বৃদ্ধির ফলে চালের দামেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটে চাল ব্যবসায়ীরা বলেন, গত বুধবার থেকেই বাড়তি দামে চাল আনতে হচ্ছে। ট্রাকপ্রতি প্রায় ৪ হাজার টাকা বেড়েছে।
দুধের দাম এক লাফে ১০ টাকা বৃদ্ধি : প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম গত দেড় মাসে দুই দফায় লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। মিল্কভিটার পর আড়ং, প্রাণ ও ফার্মফ্রেশসহ বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দুধ এখন লিটারপ্রতি ১২০ এবং আধা লিটার ৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। উৎপাদনকারীরা পরিবহন, সংগ্রহ, প্যাকেজিং, গো-খাদ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট : বাজারে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহও কমেছে কিছুটা। চলতি মাসের শুরুর দিকেই ভোজ্য তেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়েছিল। এর ফলে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম দাঁড়ায় ২০৪ টাকায়।
এর আগে টানা প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম ছিল। দাম বাড়ানোর পর কিছুদিনের জন্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এখন আবার তা কমে গেছে। বিক্রেতাদের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো এখন বাজারে তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণে তেল ছাড়ছে। কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তবে সব বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ একই হারে কমেনি।
বেড়েছে ফলের দামও : বাজারে ফলের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি মালটা ও কমলা ৪২০ থেকে ৪৫০ এবং আপেল ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। লাল আঙুরের জন্য কেজিতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।
কী বলছেন বিশ্লেষকরা : বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে পণ্যের দাম বাড়বে এবং তা মেনে নিতে হবে— বিষয়টা এমন নয়। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির জন্য কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া কত হওয়া উচিত; বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কত হতে পারে— বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন থেকে এ বিষয়ে দ্রুত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা উচিত।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কমিশনের বলা দরকার— জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে গ্রাম থেকে ঢাকায় সবজি নিয়ে আসতে পাঁচ বা ১০ পয়সা বাড়তি খরচ হবে। এর ভিত্তিতে বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলো বাজার তদারক করলে সুফল মিলবে। কারণ তথ্য-উপাত্ত হাতে থাকলে ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকবেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার-সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে বাজারে পণ্যমূল্যে সামান্য যে পরিমাণ প্রভাব পড়ার কথা, কিছু ক্ষেত্রে তার চেয়ে প্রভাব বেশি পড়ছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে আমরা ব্যবসায়ীদের সেই সুযোগ দেব না। কারণ পরিবহন ভাড়া কেজিতে ২৫ পয়সা বাড়বে; সেই অজুহাতে দাম দ্বিগুণ বাড়াবে— এই অতি মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও