পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে উঠেছে রিসোর্ট, নেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন

বান্দরবান প্রতিনিধি

সারাদেশ

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে পাহাড়ি কন্যা বান্দরবানে দিন দিন বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যা। মেঘ, পাহাড় আর সবুজের টানে ছুটে আসা পর্যটকদের

2026-09-26T15:49:38+00:00
2026-09-26T15:49:38+00:00
 
  শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে উঠেছে রিসোর্ট, নেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন
বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৪৯ পিএম 
যত্রতত্র গড়ে ওঠা অনেক রিসোর্টেরই প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। ছবি : সময়ের আলো
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে পাহাড়ি কন্যা বান্দরবানে দিন দিন বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যা। মেঘ, পাহাড় আর সবুজের টানে ছুটে আসা পর্যটকদের রাতযাপনের সুবিধার জন্য জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন নতুন হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ। তবে এসব স্থাপনার অনেকগুলোরই প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। পাশাপাশি রিসোর্ট নির্মাণে পাহাড় কাটা, গাছপালা নিধন ও ঝিরি-ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

জেলা প্রশাসনের হিসাবে, বান্দরবানে বর্তমানে ৭৯টি হোটেল ও রিসোর্ট অনুমোদন পেয়েছে। বিপরীতে পরিবেশ অধিদফতর থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে মাত্র ৩২টি। তবে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর ও ফায়ার সার্ভিসের কোনো সংস্থার কাছেই জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই।

হোটেল-রিসোর্ট ও কটেজ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার ছোট-বড় হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। বিশেষ করে লামার মিরিঞ্জা এলাকায় গত কয়েক বছরে ব্যাপকভাবে বেড়েছে রিসোর্টের সংখ্যা।


পরিবেশ অধিদফতর বান্দরবান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব বলেন, জেলায় ৩২টি রিসোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। ২০টি বা তার বেশি কক্ষের রিসোর্ট বা হোটেলের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র পরিবেশ অধিদফতর দিয়ে থাকে। আইনি কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে ছোট ছোট রিসোর্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

লামা মিরিঞ্জা ভ্যালী রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমানের দাবি, মিরিঞ্জা এলাকায় প্রায় ৮৯টি রিসোর্ট রয়েছে। এসব রিসোর্ট ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তবে অনেকেরই পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন কিংবা ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই।

লামা রিসোর্ট মালিক সমিতির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন রফিক বলেন, উপজেলায় মোট কতটি রিসোর্ট বা কটেজ রয়েছে, তার সঠিক হিসাব সমিতির কাছেও নেই। অনেকে পাহাড়ে জুমঘর তৈরি করে রিসোর্টের নামে ব্যবসা করছেন।

পাহাড় কাটা ও পরিবেশ দূষণ

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, রিসোর্ট নির্মাণের সময় বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটা, গাছপালা নিধন এবং ঝিরি-ছড়া ভরাট করা হচ্ছে। এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ঝিরি-ছড়া ও নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে দূষিত হচ্ছে পাহাড়ি জলাধার ও আশপাশের পরিবেশ।

লামার ইয়াংছা পাড়ার বাসিন্দা মংচিং মার্মা বলেন, রিসোর্টের বর্জ্য ঝিরি ও ছড়ায় গিয়ে পড়ায় তাদের একমাত্র পানির উৎস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে বাধ্য হয়ে সেই পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।


রিসোর্ট ও কটেজগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। বিশেষ করে মিরিঞ্জা এলাকায় কাঠ, বাঁশ, ছন ও টিন দিয়ে নির্মিত অনেক কটেজে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ যান চলাচলের উপযোগী সড়কেরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে কোনো স্থাপনায় আগুন লাগলে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের চেয়ারপারসন জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, গত কয়েক বছরে বড় বড় পাহাড়ের চূড়ায় একের পর এক ইকো নামের রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও অনেকেরই তা নেই। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে কটেজের নামে পাহাড়ি এলাকা অপরিকল্পিতভাবে ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই দ্রুত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ইতিবাচক যোগাযোগ তৈরি হলেও অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা ও গাছপালা নিধনের কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারাতেও।

লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন বলেন, উপজেলায় মোট কতটি রিসোর্ট রয়েছে, তার সঠিক হিসাব নেই। তবে রিসোর্ট মালিকদের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।


বান্দরবান জেলা ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান আনসারী বলেন, জেলায় মোট কতটি হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে, তার সঠিক তথ্য ফায়ার সার্ভিসের কাছে নেই। তবে চলতি বছরে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ৬০টি হোটেল-রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র নবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জেলার অনেক হোটেল-রিসোর্ট কাঠ, ছন, বাঁশ ও টিন দিয়ে নির্মিত হওয়ায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। এসব স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।


জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, বান্দরবানে পর্যটন করপোরেশন বা পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কোনো স্থানীয় কার্যালয় নেই। হোটেল ও রিসোর্ট-সংক্রান্ত বিষয় জেলা প্রশাসন ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ দেখভাল করে।

তিনি বলেন, জেলায় বর্তমানে ৭৯টি হোটেল-রিসোর্ট অনুমোদন পেয়েছে। এছাড়া আরও ২০ থেকে ৩০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার জন্য তাদের অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

সময়ের আলো/এনএন

  বিষয়:   পাহাড়ের চূড়া  রিসোর্ট  অনুমোদন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: