নেপালে ভয়াবহ বন্যার এক মাস পেরোলেও এখনও সন্ধান মেলেনি সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা পড়ারাও রয়েছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ হিমালয় অঞ্চলে বাড়তে থাকা জলবায়ু ঝুঁকির সতর্কবার্তা হিসেবে বন্যার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই দুর্যোগ কেবল কোনো স্থানীয় ট্র্যাজেডি নয়, পুরো বিশ্বের জন্য এক সতর্কবার্তা। আমি আজ আপনাদের কাছে জানতে চাই, আমরা কি সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনতে পেয়েছি?
আন্তর্জাতিক সহায়তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বালেন্দ্র শাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমানা চেনে না। হিমবাহ আর বন্যা তো পাসপোর্ট-স্ট্যাম্প দেখে যাতায়াত করে না। এবিসি নিউজ লিখেছে, প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি বাড়ি। নেপাল সরকারের হিসাবে, বন্যার পর পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, এখনও নিখোঁজ রয়েছে ৫ হাজার ৬৪৪ জন। উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে মাত্র ১১২টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শনাক্তকরণের অপেক্ষায় বাকি ১ হাজার ৩৩৩টি মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছে। মৃতদের পরিচয় শনাক্তে কাঠমান্ডুর নেপাল পুলিশ হাসপাতালে তাঁবু খাটিয়ে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা নেওয়া হচ্ছে। সেখানে নেপালের চিকিৎসকদের সহায়তায় কাজ করছেন ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরা।
বন্যা কেড়ে নিয়েছে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী রবি কুমার থাপা মগরের স্ত্রী, ভাই, ভাবি ও মাকে। ছবি দেখে রবির স্ত্রী শনাক্ত হলেও তাকে দেখার আগেই দাফন করে ফেলে কর্তৃপক্ষ। ডিএনএ মেলানোর আইনি জটিলতায় মরদেহ হস্তান্তরে দেরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত খড়কুটোর কুশতুল বানিয়ে স্ত্রীর শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে হয় তাকে। নুয়াকোটের আশ্রয়শিবিরে থাকা ৩২ বছর বয়সি পাসং মায়া তামাং জানান, বন্যার দিনে স্কুলে গিয়ে ভেসে যায় তার ছোট ছেলে।
তিন দিন পর দক্ষিণ অঞ্চলের একটি জেলায় সন্তানের মরদেহ পাওয়া গেলেও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেখানে গিয়ে শেষবার দেখার সুযোগ পাননি তিনি। ২৬ আগস্ট সকালে শিক্ষার্থীরা যখন স্কুলে পৌঁছাচ্ছিল, তখনই হঠাৎ হড়কা বান নেমে আসে। নুয়াকোটের বাসিন্দা আস্ত মান ডঙ্গোল জানান, বড়রা পাহাড়ে উঠে আত্মরক্ষা করতে পারলেও স্কুলের পোশাক পরা ছোট ছোট শিশুরা স্রোতে ভেসে যায়।
বন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি হারিয়ে আবারও বিদেশে পাড়ি জমানোর কথা ভাবছেন নারায়ণ প্রসন্ন নামের এক ব্যক্তি। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে ঘর হারিয়ে সৌদি আরবে ৫ বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে নতুন বাড়ি তৈরি করেছিলেন তিনি। এবারের বন্যায় আবারও তার সব শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এই বন্যা আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন আমি কী করব, বুঝতে পারছি না।
নেপাল সরকার জানিয়েছে, বন্যায় অন্তত ৩৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা পুনর্গঠনে কাজ করছেন সড়ক প্রকৌশলী ইশমিতা শাহ। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছাতে এবং যাতায়াত চালুর জন্য সেনাবাহিনীর সহায়তায় অস্থায়ী সেতু ও সড়ক নির্মাণের কাজ জোরকদমে চলছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি