খরস্রোতার ভাঙন ঠেকাতে কোদাল–ঝুড়ি নিয়ে গ্রামবাসীর লড়াই

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

সারাদেশ

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীপুর-কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের দক্ষিণ পাশে এবং তালা উপজেলার জালালপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাঁধ

2026-09-28T19:36:16+00:00
2026-09-28T19:36:16+00:00
 
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
সাতক্ষীরার কপোতাক্ষ নদ
খরস্রোতার ভাঙন ঠেকাতে কোদাল–ঝুড়ি নিয়ে গ্রামবাসীর লড়াই
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৬ পিএম 
খরস্রোতার ভাঙন ঠেকাতে কোদাল–ঝুড়ি নিয়ে গ্রামবাসীর লড়াই। ছবি : সময়ের আলো
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীপুর-কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের দক্ষিণ পাশে এবং তালা উপজেলার জালালপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাঁধ রক্ষার জন্য স্থানীয় এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে যাচ্ছেন। এর মধ্যেই আশাশুনি উপজেলার শ্রীপুর-কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের দক্ষিণ পাশে প্রায় ১৫০ ফুট বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

জোয়ারের পানির চাপে এই ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এতে যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাঁধসংলগ্ন এলাকার মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

দ্রুত এই ভাঙন রোধ করা না গেলে প্রতাপনগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ১০ থেকে ১২টি গ্রাম প্লাবিত হতে পারে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন। বেড়িবাঁধের পাশাপাশি ওয়াপদা সড়কের একটি অংশও ধসে পড়ায় ওই পথে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কুড়িকাহুনিয়া এলাকায় বেড়িবাঁধের একটি অংশের ভাঙন ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। জোয়ারের পানির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়তে পারে।

প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় বাসিন্দারাই জরুরি ভিত্তিতে কাজে নেমে পড়েছেন। নিজেদের উদ্যোগে বস্তা ও মাটি ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন তারা। সোমবার সকাল ১০টা থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে এই কাজ শুরু করেন। বস্তা, মাটি ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, সকাল থেকে স্থানীয় জনগণকে নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমরা ভাঙন মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছি। দ্রুত বালি ভরাট করে ভাঙনস্থল মেরামত করা না হলে ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ভাঙনের পরই সাধারণত পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করে, আগে থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এ কারণে আমাদের সবসময় ভোগান্তি পোহাতে হয়। যে জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে, তার সামনেই খাল। বেড়িবাঁধটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে প্রতাপনগর ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী আনুলিয়া ইউনিয়নও প্লাবিত হয়ে যেতে পারে। আমরা দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের পদক্ষেপ চাই।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন দ্রুত রোধ করা না গেলে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়বে। এতে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও মৎস্যঘেরসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে বালি ও মাটি ফেলে ভাঙন ঠেকানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কার করতে হবে।

এ বিষয়ে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করার জন্য জানিয়েছি। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তারা দ্রুত কাজ শুরু করবে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহমান তাজকিয়া জানান, জোয়ারের চাপের কারণে ওই জায়গায় ফাটল ও ধস নামছে। তারা দ্রুত যেভাবে সম্ভব বস্তা ডাম্পিং করে এবং পেছনে জিও টিউব দিয়ে বিকল্প বাঁধ তৈরি করে দিচ্ছেন।

এলাকাবাসী সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে বাঁধ সংস্কার ও শক্তিশালী করারও দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে তালা উপজেলায় কপোতাক্ষ নদের অব্যাহত বেড়িবাঁধ ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জালালপুর ইউনিয়নের কয়েকটি জনপদ। অবিলম্বে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না হলে ওই এলাকার বাসিন্দাদের নতুন করে আশ্রয়হীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তালার জেঠুয়া বাজার থেকে কপিলমুনিমুখী কপোতাক্ষ নদের পূর্ব পাশের মালোপাড়া মহাশ্মশান পর্যন্ত দেড় কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ ভাঙনের কবলে রয়েছে। তিনটি স্থানে ৮০ থেকে ১০০ ফুট করে বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। জোয়ারের পানির সঙ্গে কচুরিপানা বিলের মধ্যে ঢুকছে। কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ মাত্র এক থেকে দেড় হাত চওড়া রয়েছে।

কপোতাক্ষ খরস্রোতা হওয়ার কারণে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত এই নদের দুই পাড়ের লক্ষাধিক বাসিন্দাকে বছরের সাত থেকে আট মাস জলাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে জীবনযাপন করতে হতো। ১৯৯৬ সালে তালা উপজেলার জেঠুয়া বাজার থেকে জেঠুয়া মহাশ্মশান পর্যন্ত দেড় কিলোমিটারের মধ্যে কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভাঙলে কপোতাক্ষ নদ মালোপাড়া, ঠাকুরপাড়া, পালপাড়া, বেনেপাড়া, পরামানিকপাড়া ও ঘোষপাড়ার মালিকানা জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

এতে ওই এলাকার তিন হাজার বিঘার বেশি জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় চার শতাধিক পরিবার পেশা পরিবর্তন করে সাতক্ষীরা শহর, খুলনা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চলে গেছে এবং এলাকার মানচিত্রও পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে জেঠুয়া বাজার থেকে জেঠুয়া মহাশ্মশান পর্যন্ত বেড়িবাঁধে নতুন করে ফাটল শুরু হয়। এক সপ্তাহ আগে জেঠুয়া বাজারসংলগ্ন হাজির ভাটার পাশে তিনটি স্থানে ৪০ থেকে ৫০ ফুট করে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জোয়ার-ভাটা অব্যাহত রয়েছে।

আরও কয়েকটি স্থানের বাঁধ এক থেকে দেড় হাতের মতো চিকন হয়ে গেছে। জোয়ারের তীব্রতা বাড়লে যেকোনো মুহূর্তে দুর্বল ওই বাঁধগুলো ভেঙে জেঠুয়া, শ্রীমন্তকাটি, কানাইদিয়া, নেহালপুর, কৃষ্ণকাটিসহ সাতটি গ্রাম প্লাবিত হতে পারে। এতে কয়েক হাজার বিঘার আমন ধানের খেত, সবজির খেত, মাছের ঘের ও বসতবাড়ি ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মালোপাড়ার সুরতী রানী ঘোষ বলেন, স্বামী ও শ্বশুরদের ২০ বিঘার বেশি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। তিন-তিনবার বাড়ি বানিয়ে তা ছাড়তে হয়েছে। কোনোপ্রকারে ছাপড়া ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, মেয়েকে কোনো রকমে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে বিশ্বনাথ ঘোষ পেটের দায়ে এলাকা ছেড়ে খুলনার একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করেন। তাদের এই কষ্ট দেখার কেউ নেই।

ঘোষপাড়ার সুকুমার ঘোষ বলেন, তার ১০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জমির জন্য কোনো সরকারি অনুদান পাননি। ভৌগোলিক কারণে তারাও রয়েছেন অস্তিত্ব সংকটে। একইভাবে ঠাকুরপাড়ার রবীন্দ্র নাথ চক্রবর্তী জানান, তার ও তার পূর্বপুরুষদের ১৮ বিঘা জমি কপোতাক্ষ গ্রাস করেছে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকায় চলে গেছেন।

জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া কার্তিক পরামানিক, অরুণ দত্তসহ কয়েকজন বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বেড়িবাঁধ সংস্কার করা না হলে এই এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আমন ধানের খেত, সবজি খেত, মাছের ঘের ও বাড়িঘর ভেসে যেতে পারে। তাই দ্রুত বেড়িবাঁধ সংস্কারের দাবি জানান তারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সাতক্ষীরা-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া জানান, জেঠুয়ার ভাঙনকবলিত এলাকায় তাদের কোনো বেড়িবাঁধ নেই। এরপরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে এখনো অনুমতি না পাওয়ায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   সাতক্ষীরা  কপোতাক্ষ নদ  খরস্রোতা  ভাঙন  কোদাল  ঝুড়ি  গ্রামবাসী  লড়াই  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: