চুরির অপবাদে বাজারের খুঁটির সঙ্গে রাতভর বেঁধে এক যুবককে নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিও এখনো মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। নির্যাতনের শিকার রায়হানুল হক অনিকের জন্য পানি চেয়ে কাঁদতে থাকা ছোট্ট মেয়ে তুবা বিনতে অরনির সেই দৃশ্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এবার অনিককে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে (রিহ্যাব) পাঠিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে তিনি সুস্থ হয়ে না ফেরা পর্যন্ত তার স্ত্রী-সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় অনিককে একটি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি তিন মাস চিকিৎসা নেবেন।
অনিকের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস জানান, তাদের সংসারে আয়ের নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই। তিনি এইচএসসি পাস। তাদের দুই সন্তান—তুবা (৯) ও তুরিন ইসলাম তুনা (৩)। স্বামীর কর্মসংস্থান অথবা নিজের একটি চাকরি হলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
অনিকও নতুন করে জীবন শুরু করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, ভালোভাবে জীবনযাপন করতে চান। কেউ আয়ের একটি পথ তৈরি করে দিলে নিজেকে বদলে ফেলবেন। দুই মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে হলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে একটি কাজের সুযোগ চান তিনি।
অনিকের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ ও নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে তার মেয়ে তুবার কারণে। স্থানীয়দের কাছ থেকে বাবাকে বেঁধে মারধরের খবর পেয়ে সকালে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা। সেখানে বাবাকে মারধর করতে দেখে হামলাকারীদের পায়ে জড়িয়ে ধরে তাকে না মারার জন্য কাঁদতে থাকে সে।
একপর্যায়ে বেঁধে রাখা অনিক মেয়ের কাছে পানি চান। তুবা বাজারের একটি দোকান থেকে পানি, রুটি ও এক কাপ চা এনে নিজের হাতে বাবাকে খাওয়ায়। ঘটনাস্থলে থাকা এক যুবক সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। এরপর স্থানীয় প্রশাসনও অনিক ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়।
তুবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘আমার বাবা ভালো বাবা। তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে।’ বাবার সঙ্গে অন্যায় না হওয়ার পাশাপাশি তিনি ভালো হয়ে ফিরে আসুন—এমনটাই চায় শিশুটি।
তুবার মা জান্নাত বলেন, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তুবা স্যান্ডেল পরারও সময় না নিয়ে বাবার কাছে দৌড়ে যায়। তার চোখের সামনে বাবাকে মারধর করা হচ্ছিল। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরে মারতে নিষেধ করে কান্নাকাটি করছিল। কিন্তু প্রথমে কেউ তার কথা শোনেনি।
অনিকের দাবি, পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। তার কাছ থেকে চুরির কোনো মালামাল উদ্ধার হয়নি এবং অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণও দেখানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, তাকে পৈতৃক ভিটা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এমন করা হয়েছে।
অনিক বলেন, কোনো মেয়েই চায় না তার বাবাকে এমন অবস্থায় দেখতে। মেয়ের সামনে বেঁধে রেখে মারধরের দৃশ্য দেখে তার মরে যেতে ইচ্ছা করছিল। এখন তিনি সবার সহযোগিতায় সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান।
উজিরপুর ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, অনিক ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি কিছুটা মাদকাসক্ত। তাই তাকে সংশোধনের সুযোগ দিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় রিহ্যাবে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তিন মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ইউএনও বলেন, অনিক সুস্থ হয়ে না ফেরা পর্যন্ত তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রবাসীদের সহযোগিতায় করা হবে। তুবার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও প্রশাসন পাশে থাকবে।
তিনি জানান, তুবা যে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে সেখানে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা তার লেখাপড়ার প্রতি বিশেষ নজর রাখবেন বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি তুবার জন্য একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হচ্ছে, যেখানে কেউ সহযোগিতা করতে চাইলে অর্থ পাঠাতে পারবেন।
অনিককে রিহ্যাবে পাঠানোর সময় উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি এসএম আলাউদ্দিন পরিবারটিকে নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান ইউএনও। তিনি বলেন, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মূলত বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসার দৃশ্য। অনিক সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলে তাকে কর্মজীবনে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বামরাইল বাজারের একটি দোকানে চুরির চেষ্টার অভিযোগ তুলে অনিককে ধরে মারধর করা হয় এবং পরে বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। রাতভর অনাহারে থাকা বাবার জন্য সকালে রুটি ও চা এনে নিজের হাতে খাইয়েছিল তুবা। সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
সময়ের আলো/এসএকে