দরিদ্রতাকে পিছনে ফেলে বিচারকের আসনে তুরি সম্প্রদায়ের কাজল

‎হ্লাথোয়াইছা চাক, রাবি প্রতিনিধি

সারাদেশ

‎চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাই গ্রামে একটি খাস পুকুরের পাড়। সেখানে ছোট্ট একটি জীর্ণ ঘর, যার নিচের জমিটুকুও পরিবারের নিজের নয়।

2026-09-30T12:46:10+00:00
2026-09-30T12:46:10+00:00
 
  বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
দরিদ্রতাকে পিছনে ফেলে বিচারকের আসনে তুরি সম্প্রদায়ের কাজল
‎হ্লাথোয়াইছা চাক, রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম 
কাজল পাঁড়ে। ছবি : সংগৃহীত
‎চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাই গ্রামে একটি খাস পুকুরের পাড়। সেখানে ছোট্ট একটি জীর্ণ ঘর, যার নিচের জমিটুকুও পরিবারের নিজের নয়। এই ঘরেই বড় হয়েছেন কাজল পাঁড়ে। আজ তিনি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে (বিজেএস) সিভিল জজ (সহকারী জজ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত। ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় ২০০ জনের তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি। তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচার বিভাগে যোগ দেওয়ার সুপারিশ পাওয়া প্রথম ব্যক্তি তিনি, এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎কাজলের জন্ম ১৯৯৭ সালে। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট, আবার একমাত্র ছেলে। বাবা অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন, মা সংসারে খেটেছেন অবিরাম। পদবি ‘পাঁড়ে’ তুরি জনগোষ্ঠীর একটি প্রচলিত পদবি। মাধাইপুর ও মাধাই গ্রামের এই জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষ কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল।

‎দারিদ্র্যই কি কাজলের একমাত্র বাধা ছিল না। স্কুলে পা রেখেই সামনে এসে দাঁড়ায় ভাষা। ঘরে তুরি ভাষায় কথা বলে বড় হওয়া শিশুটি মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেন, শ্রেণিকক্ষের বাংলা প্রায় অচেনা। কাজল বলেন, আমি প্রথম ধাক্কা খেয়েছিলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সবাই বাংলায় কথা বলত। আমি মাতৃভাষায় কথা বলে অভ্যস্ত ছিলাম। শিক্ষক ও সহপাঠীরা যখন বাংলায় কথা বলতেন, তখন অনেক কিছুই বুঝতে পারতাম না। ভাষাগত এই প্রতিবন্ধকতা আমার জন্য খুব কষ্টের ছিল। পরে ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা আয়ত্ত করি এবং শিক্ষকদের কথা বুঝতে শুরু করি।

‎শুরুতেই সহপাঠীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার সেই ঘাটতি আর হীনম্মন্যতা সঙ্গে নিয়েই তিনি পড়া চালিয়ে গেছেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার টালিথা কুমী মিশন বোর্ডিং স্কুলে। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি কাটে নজিপুর মডেল হাইস্কুলে। পরে মিশন ছেড়ে নিজ এলাকায় ফিরে এনায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং ২০১৩ সালে এসএসসি পাস করেন। ২০১৬ সালে রহনপুর ইউসুফ আলী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি।

‎২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেলেন তিনি। কিন্তু আনন্দের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল টাকার প্রশ্ন। ভর্তি ফি দেওয়ার মতো অর্থ হাতে ছিল না, শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্যও না। তখন এগিয়ে এলেন বড় বোন কল্পনা। নিজের গরু বিক্রি করে টাকাটা তুলে দিলেন ভাইয়ের হাতে। বাবা, মা, মামা, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরাও যে যেভাবে পারেন পাশে দাঁড়ান। কাজল বলেন, ২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার দিনই স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমি বিচার বিভাগের ক্যাডার হব। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন, সাধ্যমতো পরিবারকেও সাহায্য করেছেন।
‎
‎সংগ্রামটা শুধু টাকার ছিল না। ভাষা, চেহারা, সংস্কৃতি আর খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা ছোটবেলা থেকেই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। কাজলের কথায়, সবার দরিদ্রতা থাকে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে দরিদ্রতার সঙ্গে সামাজিক ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাও ছিল। ভূমিহীনতা ছিল আরেক বাস্তবতা। নিজের জমি না থাকায় অন্যের জমির ওপর ভর করে বাঁচতে হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভূমিকে কেন্দ্র করে তাদের সম্প্রদায়ের মানুষকে সময়ে সময়ে নিপীড়ন ও অনিরাপত্তার মুখে পড়তে হয়েছে। স্বজন হারানো, দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এবং নারীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা শৈশবের স্মৃতিতে গভীর ছাপ রেখেছে। এসব তার মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু হারের কারণ হতে পারেনি। শিক্ষা আর নিজের অবস্থান বদলের ইচ্ছাকেই তিনি সামনে রেখেছেন।

‎এরপর এল করোনা। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে থমকে যায় শিক্ষাজীবন। তাদের ব্যাচ প্রায় তিন বছর তৃতীয় বর্ষে আটকে ছিল। একদিকে সেশনজট, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ঘরের টানাটানি। তবু পড়াশোনা আর পরিকল্পনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে শুরু করেন বিজেএসের প্রস্তুতি।

‎প্রস্তুতির আনুষ্ঠানিক যাত্রা এলএলএম পরীক্ষার পর, ২০২৩ সালের জুলাইয়ের দিকে। আগে সিলেবাস জোগাড় করে নিজের পরিকল্পনা সাজান। তারপর প্রশ্নব্যাংক কিনে প্রশ্নের ধরন বোঝার চেষ্টা করেন, ধীরে ধীরে নিজের নোট বানাতে থাকেন। দেশের প্রচলিত বইয়ের পাশাপাশি ভারতের কয়েকটি শিক্ষামূলক ইউটিউব চ্যানেলেরও সাহায্য নিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের বড় ভাই মতিউর রহমান, বর্তমানে যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিভিল জজ। প্রায় তিন বছর তার মেন্টরশিপে ছিলেন কাজল। কাজল বলেন, তিনি সহায়তা না করলে সম্ভবত আমি এখনও প্রস্তুতির ধরণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতাম না।

‎প্রস্তুতির সময় বিভাগের আরেক বড় ভাই, বর্তমানে রাজশাহীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফজলে রাব্বিও তাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেছেন। ফল প্রকাশের দিন তিনিই ফোন করে প্রথম কাজলকে ফলাফলের খবর জানান এবং অভিনন্দন জানান।

‎প্রস্তুতির এই পথচলায় আরও একজনের অবদান আলাদা করে উল্লেখ করেন কাজল। তিনি ডলিয়ারা খাতুন। তার বাড়ি কাজলের পাশের গ্রামে এবং বর্তমানে পরিবার নিয়ে রাজশাহীতে থাকেন। রাজশাহীতে টিউশনি খুঁজে দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থিক সংকটেও তিনি কাজলকে সহায়তা করেছেন। এমনকি পরীক্ষার আগে প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেওয়ার জন্য তাকে টিউশনি না করেও নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। ‎কাজল বলেন, মা-বাবার পরেই তিনি আমাকে নানা সংকটে শক্তি যুগিয়েছেন।

‎ফল প্রকাশের দিন বুধবার সন্ধ্যায় খবরটা প্রথম আসে রাজশাহীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জনাব ফজলে রাব্বি স্যারে ফোনে জানান। পরে ওয়েবসাইটে নিজের চোখে দেখে নিশ্চিত হন। ১৮তম বিজেএসে ২০০ জনকে সিভিল জজ (সহকারী জজ) পদে সুপারিশ করা হয়েছে, ওই পদে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে কাজলও একজন। যে তরুণ একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকাই জোগাড় করতে পারেননি, তিনি এখন বিচার বিভাগে কাজ করার দোরগোড়ায়। ফল দেখার পর মনে পড়েছে সেই কঠিন দিনগুলোর কথা। বড় বোনের গরু বিক্রির টাকা, বাবার শ্রম, মায়ের পরিশ্রম, আত্মীয় ও বন্ধুদের সহযোগিতা আর টিউশনির টাকায় চালানো পড়াশোনা।


‎এই সাফল্য কি শুধু কাজলের একার? নিজে তা মনে করেন না। ভূমিহীন কৃষক পরিবারের সন্তানের ভাষার দেয়াল পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা এবং সেখান থেকে বিচার বিভাগে পৌঁছানো তার সম্প্রদায়ের কাছেও বড় ঘটনা। যে গ্রামে বেশির ভাগ মানুষ কৃষিকাজ আর দিনমজুরির ওপর নির্ভর করে, সেখান থেকে একজন তরুণের বিচারক হওয়ার সুযোগ পাওয়াকে গ্রামের মানুষ নিজেদেরও অর্জন বলে দেখছেন।

‎বিজেএসের প্রস্তুতি নেওয়া অনুজদের জন্য তার পরামর্শ সোজা। বিজেএস প্রস্তুতিতে কোনো শর্টকাট রাস্তা বেছে না নিয়ে নিজের দুর্বলতাগুলো বুঝে গুছিয়ে এগোতে হবে। এতে সময় লাগলেও সফলতার সম্ভাবনা বাড়ে। শর্টকাট খুঁজলে প্রিলিমিনারি পাস করলেও লিখিত পরীক্ষায় সমস্যা হতে পারে, আবার কোনোভাবে লিখিত পাস করলেও চূড়ান্ত ফলাফল নাও আসতে পারে। তখন একই চক্র চলতেই থাকে।

‎মাধাইয়ের সেই খাস পুকুরপাড়ের ঘর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ, সেখান থেকে দীর্ঘ প্রস্তুতির পথ ধরে বিচার বিভাগ। কাজল পাঁড়ের এই যাত্রা তাই শুধু একটি পরীক্ষায় ভালো ফলের গল্প নয়। ভাষার দেয়াল, দারিদ্র্য আর বৈষম্যের সঙ্গে লড়ে শিক্ষাকে জীবন বদলের হাতিয়ার করে তোলার গল্প। তুরি জনগোষ্ঠীর এই তরুণের সাফল্য তার সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্মের সামনে একটি নতুন দৃষ্টান্তও রেখে গেল।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   দরিদ্রতা  বিচারক  তুরি সম্প্রদায়  কাজল  ‎চাঁপাইনবাবগঞ্জ  গোমস্তাপুর  বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস  বিজেএস  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: