গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন আইসিটি ট্রেনিং অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টার ভবনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণকাজের শুরু থেকেই ভবনটির বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত সামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (EDCF) অর্থায়নে ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিম্নমানের ইট দিয়ে কাজ চলছে। পাশেই বসে আছেন দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত ইঞ্জিনিয়ার। সিমেন্ট এবং বালুর ভাগেও অসংগতি। ব্যবহিত বালুগুলোও নিম্নমানের। বাথরুমের পানি মাটিতে শোষণ করানোর জন্য যে গর্ত বা চেম্বার (সোক পিট) তৈরি করা হয়েছে সেটির গভীরতাও মাত্র সাত থেকে আট ফুট। জানালায় ব্যবহৃত লোহার গ্রিলের গুণগত মানও নিম্নমানের। এছাড়াও নানা অসংগতি দেখা গেছে নির্মাণাধীন ভবনে।
নির্মাণাধীন ভবনটির কাজ কোন প্রকল্পের আওতায় হচ্ছে, প্রকল্পের বরাদ্দ কত, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা ঠিকাদার কে, কী ধরনের নকশা ও কারিগরি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং কাজ শুরুর ও শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা কত- এসব কোনো তথ্যই নির্মাণস্থলে দৃশ্যমান নয়। প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্যসংবলিত কোনো সাইনবোর্ডও সেখানে সাঁটানো হয়নি। ফলে সরকারি অর্থে চলমান এ নির্মাণকাজের ব্যয়, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও সময়সীমা নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইট, বালু, খোয়া ও অন্যান্য সামগ্রীর মান নিয়ে অসংগতি রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি স্থাপনা নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হলে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
এদিকে নির্মাণকাজের বিস্তারিত তথ্য, প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য জানার চেষ্টা করা হলেও বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিনে নির্মাণকাজ পরিদর্শন করে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান পরীক্ষা করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় পান ব্যবসায়ী মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, এখানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। তারমধ্যে গতকাল ৩ নম্বর ইট দিয়ে কাজ হচ্ছিলো। পরে লোকজন আসিয়া বাঁধা দেয়। তবুও আজকে আবার ওই ৩ নম্বর ইট দিয়ে কাজ করা হয়েছে।
কথা হয় আরেক স্থানীয় মো. রফিকুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, এখানে যে একটা ভবন হচ্ছে। সেটা কোন প্রকল্পের বা কত টাকা বরাদ্দ তা কেউ জানেন না। আর এটা কে শুনতে চাইলে তা কাউকে বলাও হয় না।
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা সাইট প্রকৌশলী নিজের অনিয়ম-দুর্নীতি আড়াল করতে তাঁর নিজ এলাকার লোকজন এনে নির্মাণকাজ করাচ্ছেন। বিভিন্ন নির্মান সামগ্রী ওই প্রকৌশলী তার বাড়িতে নিয়ে যান।
ভবন নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. নুরুন্নবী মিয়া ওরফে লিমনের সঙ্গে দেখা হয় নির্মাণাধীন ভবনের কাছে। প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইতেই তিনি মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেন। কিছুক্ষণ পরপরই জনৈক ব্যক্তি আসেন এবং তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।
নির্মাণকাজের প্রকল্প, বরাদ্দ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, কাজের সময়সীমা ও কারিগরি বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে প্রকৌশলী মো. নুরুন্নবী মিয়া এসব বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে জানতে মো. আবদুল মান্নান সরকার ও মো. সাজ্জাদ হোসাইনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁদের দুজনের মোবাইল নম্বরও দেন।
পরে এ বিষয়ে জানতে ফোন দেয়া হয় মো. আবদুল মান্নান সরকারের মোবাইল ফোনে। তিনি থ্রি স্টার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন এর স্বত্বাধিকারী। আবদুল মান্নান সরকার জানান, তিনি এ ভবন নির্মাণে ম্যান পাওয়ারের ঠিকাদারি করেছেন মাত্র। তার বরাদ্দ ছিলো ২০ লক্ষ টাকা। খরচ হয়েছে তার ২২ লক্ষ টাকা। লোকসান গুনতে হয়েছে ২ লক্ষ টাকা। এর বেশি কিছুই জানা নাই।
এরপর ফোন দেয়া হয় মো. সাজ্জাদ হোসাইনের মেবাইল ফোনে। তিনি ভবন নির্মাণে অর্থদাতা কোরিয়ান প্রতিনিধি। তিনি জানান, কাজে অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কখন কি কাজ হচ্ছে এবং পরবর্তীতে কি কাজ করা হবে তার সবগুলোই প্রতক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আমরা দেখছি। কতো টাকা বরাদ্দ, কবে কাজ শুরু হয়েছে, শেষ কবে ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন এবং ব্যানবেইস থেকে আবেদন করে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।
উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো বেলাল হোসেন বলেন, ভবন নির্মাণে যেনো কোনো ধরনের নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার না করা হয় সে বিষয়ে বহুবার তাদের বলেছি। তবুও এ ধরনের কাজ অপ্রত্যাশিত এবং অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি আবারও তাদের সাথে কথা বলব। এরপরও যদি তারা না শুধরায় তাহলে ব্যানবেইসকে লিখব।
কতো টাকা বরাদ্দ, কারা কাজ করছেন, কাজের আছে কি না কোনো তথ্যই নেই তার কাছে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, নির্মাণাধীন ভবণের কাছে প্রকল্পের সাইনবোর্ড না থাকা এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ করার বিষয়টি দুঃখজনক। বিষয়গুলো আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।
সময়ের আলো/এনএন