সিরিয়া সরকারের প্রতিনিধি এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরা তুরস্কে মুখোমুখি গোপন বৈঠক করেছেন। দীর্ঘদিনের বৈরী দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানিয়েছেন ছয়টি সূত্র। তাদের দাবি, এটি দুই পক্ষের মধ্যে এ ধরনের প্রথম জানা বৈঠক।
সূত্রগুলোর মধ্যে সিরিয়ার দুই কর্মকর্তা, একজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একজন জ্যেষ্ঠ লেবানিজ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা রয়টার্সকে জানান, গত মাসে অন্তত একবার সিরিয়ার কর্মকর্তা ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপনে বৈঠক হয়।
হিজবুল্লাহ বহু বছর ধরে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে রক্ষায় সেখানে যোদ্ধা পাঠিয়েছিল।
২০২৪ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের আকস্মিক অভিযানে আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিরিয়ার নতুন সরকার ও হিজবুল্লাহর মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। দামেস্কের অভিযোগ, হিজবুল্লাহ সিরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে অস্ত্র স্থানান্তর করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার সামরিক বাহিনীকে লেবাননে সেনা পাঠিয়ে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উৎসাহিত করছে বলে সূত্রগুলো জানায়।
গত মাসের বৈঠকে হিজবুল্লাহর প্রতিনিধি এবং সিরিয়ার গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। ছয়টি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তুরস্কের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার আমন্ত্রণে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ হিসেবে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
সংবেদনশীল বৈঠক নিয়ে কথা বলার কারণে সব সূত্রই নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলেছেন। বৈঠকের খবর আগে প্রকাশিত হয়নি।
পারস্পরিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা
বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যকার উত্তেজনার বিষয়গুলো সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং আলোচনা ভালোভাবেই এগিয়েছে বলে জানান মার্কিন কর্মকর্তা, সিরিয়ার কর্মকর্তারা এবং লেবাননের ওই নিরাপত্তা সূত্র।
সিরিয়ার এক কর্মকর্তা বলেন, দুই পক্ষই একমত হয়েছে যে তাদের মধ্যে কোনো শত্রুতা নেই। সিরিয়া হিজবুল্লাহকে আশ্বস্ত করেছে, লেবাননে গোষ্ঠীটিকে নিরস্ত্র করতে তারা সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না।
এর বিনিময়ে সিরিয়ার কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহকে সীমান্তপথে অস্ত্র পাচারের চেষ্টা বন্ধ এবং সিরিয়ায় থাকা তাদের অবশিষ্ট গোপন সেলগুলো ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানান। বিশেষ করে দক্ষিণ সিরিয়ায় থাকা সেলগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার সিরিয়া জানায়, দক্ষিণ সিরিয়ায় রকেট হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমন একটি হিজবুল্লাহ সেল তারা আটক করেছে। তবে হিজবুল্লাহ বুধবার এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, সিরিয়ার ভূখণ্ডে তাদের কোনো উপস্থিতিই নেই এবং সেখানে কোনো নিরাপত্তা বা সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তারা জড়িত নয়।
সিরিয়ার ওই কর্মকর্তা বলেন, অস্ত্র পাচার বন্ধ ও সিরিয়াভিত্তিক সেলগুলো ভেঙে দেওয়ার অনুরোধের বিষয়ে হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরা সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তবে তারা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বৈঠক সম্পর্কে সরাসরি অবগত লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রটি জানায়, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে দুই পক্ষ অনেক অগ্রগতি করেছে।
ওই সূত্র বলেন, হিজবুল্লাহ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লেবাননের ভেতরে সিরিয়া তাদের ওপর হামলা করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এই অবস্থান।
তবে সিরিয়ার কর্মকর্তা এবং লেবাননের ওই সূত্র— উভয়েই বলেছেন, কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং বৈঠক নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল না।
লেবাননের সূত্র রয়টার্সকে আরও জানান, তুরস্কের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ প্রায় দুই মাস আগে শুরু হয়েছিল।
তবে সেপ্টেম্বরের বৈঠকটি তুরস্কের ঠিক কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কতক্ষণ চলেছিল এবং এর আগে বা পরে আরও বৈঠক হয়েছে কি না—এসব তথ্য রয়টার্স স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।
বৈঠকের উদ্যোগ তুরস্কের, অনুপস্থিত ছিল ইরান
সিরিয়া সরকার ও হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষই এর আগে একে অপরের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছিল।
জুলাইয়ে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি বলেছিলেন, দামেস্ক হিজবুল্লাহর সঙ্গে বৈঠকে বসতে প্রস্তুত। এর এক মাস পর হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাসেম টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, সিরিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
তুরস্ক নিজেকে সিরিয়ার পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে। প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক আঞ্চলিক সংলাপের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে এবং অঞ্চলটিতে স্থিতিশীলতা বাড়াতে আগ্রহী।
তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র তুরস্কই বৈঠকের জন্য চাপ দিয়েছিল। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর এই প্রচেষ্টায় সরাসরি যুক্ত থাকতে চেয়েছিল আঙ্কারা। তবে বৈঠকে হিজবুল্লাহর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরান উপস্থিত ছিল না।
লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রটি জানায়, ইরানের জ্ঞাতসারেই হিজবুল্লাহ বৈঠকে অংশ নিয়েছিল। তবে তেহরান সরাসরি আলোচনায় অংশ নিতে না পারায় হতাশ হয়। একই সঙ্গে আল-শারা আপাতত ইরানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের যেকোনো ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলেও সূত্রটি জানায়।
ওই সূত্রের দাবি, ইরানের এই হতাশাই চূড়ান্ত কোনো চুক্তি না হওয়া এবং বৈঠক সম্পর্কে কোনো ঘোষণা না দেওয়ার প্রধান কারণ ছিল।
ইরানের জেনেভাভিত্তিক স্থায়ী মিশন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ