‘অলস’ হিটলার ঘুম থেকে উঠতেন দুপুরে। ক্যাফে কিংবা সিনেমা হলে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, দলের সদর দফতরেও নিয়মিত যেতেন না। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারকে জার্মানির অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখা হতো না। বরং সে সময় তিনি ছিলেন এক বিদেশি নাগরিক, যিনি ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার কারণে সাজাপ্রাপ্তও হয়েছিলেন।
এই তথ্যগুলো উঠে এসেছে শিল্পী ও রাজনৈতিক কর্মী ফিলিপ রুখের নতুন বইয়ে। নিজের আর্ট কালেক্টিভ ‘সেন্টার ফর পলিটিক্যাল বিউটি’র মাধ্যমে আলোচনায় আসা রুখ এবার জার্মানিতে নাৎসিদের ক্ষমতায় উত্থানের ইতিহাস নতুনভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯২৮ সালের নির্বাচনে নাৎসি পার্টি পেয়েছিল মাত্র ৮ লাখ ভোট এবং ১২টি আসন। মাত্র দুই বছর পর, ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪ লাখে এবং আসনসংখ্যা হয় ১০৭। অর্থাৎ ভোট প্রায় ৯ গুণ বেড়ে যায়। এর ফলে দলটি জার্মানির দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
হিটলারের জনপ্রিয়তার পেছনে তার ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিশমাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হলেও, নতুন গবেষণায় সেই ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ১৯৩০ সালের নির্বাচনের আগে নাৎসি দলও হিটলারকে খুব বেশি প্রচারে আনেনি। কারণ তখনও তিনি জার্মানির নাগরিক ছিলেন না এবং তার বিরুদ্ধে দেশ থেকে বহিষ্কারের আশঙ্কা ছিল।
নাৎসি প্রচারপ্রধান জোসেফ গোয়েবলসের ডায়েরিতেও হিটলারের জীবনযাপনের এমন চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে গোয়েবলস তার কাজের প্রতি অনীহা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। হিটলার দলীয় কার্যালয়ে সময় না দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাফে ও সিনেমা হলে যেতেন এবং দুপুর পর্যন্ত ঘুমাতেন।
গোয়েবলসের প্রচারণাকে নাৎসিদের উত্থানের অন্যতম কারণ মনে করা হলেও ১৯৩০ সালের আগের দলীয় প্রকাশনাগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে নিম্নমানের। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মতো তাদের বড় বাজেটের প্রচারণাও ছিল না।
অন্যদিকে, মহামন্দাকেও ১৯৩০ সালের নাৎসি উত্থানের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জার্মানির অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ১৯৩১ সালের মাঝামাঝি, ১৯৩০ সালের নির্বাচনের প্রায় ১০ মাস পর।
তাহলে নাৎসিদের এত দ্রুত উত্থানের কারণ কী ছিল? রুখের গবেষণায় সামনে এসেছে রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়টি। বিরোধীদের দমন, ভয় দেখানো এবং হত্যার হুমকি নাৎসি রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। এই সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতিই ধীরে ধীরে জার্মান সমাজ ও রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
ইতিহাসের এই অধ্যায় দেখায়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরেও উগ্রতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিভাজন কীভাবে একটি প্রান্তিক শক্তিকে দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারে।
সময়ের আলো/এমকে