সাগরের সিলের জলাতঙ্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ উপকূলে ফার সিলের মধ্যে জলাতঙ্কের বিস্তার বিজ্ঞানীদের সামনে তৈরি করেছে এক অস্বাভাবিক রহস্য। কীভাবে স্থলভাগের একটি প্রাণঘাতী

2026-10-04T02:41:20+00:00
2026-10-04T02:41:20+00:00
 
  রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬,
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
রহস্যময় এক ভাইরাসের উৎসের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা
সাগরের সিলের জলাতঙ্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ উপকূলে ফার সিলের মধ্যে জলাতঙ্কের বিস্তার বিজ্ঞানীদের সামনে তৈরি করেছে এক অস্বাভাবিক রহস্য। কীভাবে স্থলভাগের একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস পৌঁছাল সমুদ্রের প্রাণীর শরীরে? জেনেটিক বিশ্লেষণ অবশেষে সেই রহস্যের একটি সম্ভাব্য উত্তর দিয়েছে। 

দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ উপদ্বীপের হাউট বে হারবারে সেদিন একটি ফার সিলের আচরণ দেখে ভয় পেয়েছিলেন কায়াকিং গাইড রবার্ট সিভরাইট। প্রাণীটি প্রথমে একটি কায়াকের কাছে ঘোরাঘুরি করছিল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সেটি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং কায়াকে কামড়াতে শুরু করে। পরে সেটি সিভরাইটকেও আক্রমণ করে কয়েকবার কামড় দেয়।

আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিতে হয়। ক্ষত সারাতে অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি দেওয়া হয় জলাতঙ্ক প্রতিরোধী চিকিৎসা। পরে সিলটিকে তীরে মেরে ফেলা হলেও পরীক্ষার জন্য তার মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এই ঘটনা ছিল আরও বড় একটি রহস্যের অংশ।

আচরণে অস্বাভাবিকতা, কিন্তু কারণ অজানা : জলাতঙ্ক এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে ভয়াবহ প্রদাহ সৃষ্টি করে। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালা কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে অন্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করলে ভাইরাসটি ছড়ায়। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর রোগটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী। কিন্তু সিলের মধ্যে জলাতঙ্ক— এটি বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক বিষয়।

২০২১ সালের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ উপকূলে সিল ও মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক সংঘর্ষ বাড়তে শুরু করে। সিলগুলো হঠাৎ মানুষকে তাড়া করছিল, কামড়াচ্ছিল এবং স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করছিল।

প্রথমে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, এর পেছনে হয়তো পরিবেশগত কোনো কারণ রয়েছে। বিশেষ করে কিছু শৈবালের তৈরি ডোমোয়িক অ্যাসিড নামের নিউরোটক্সিন প্রাণীর আচরণে অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সিলের এই আচরণকে জলাতঙ্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা প্রথম দিকে কেউ ভাবেননি।

এর আগেও ১৯৮০ সালে নরওয়ের সভালবার্ডে একটি রিংড সিলে জলাতঙ্ক শনাক্ত হয়েছিল। তবে সেই ঘটনা থেকে অন্য সিলের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

রহস্যের মোড় ঘুরল ২০২৪ সালে : পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আসে ২০২৪ সালের মে মাসে। একটি পোষা কুকুর সিলের আক্রমণের পর জলাতঙ্কে আক্রান্ত হলে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ তৈরি হয়। পশ্চিম কেপ অঞ্চলে কুকুরের মধ্যে জলাতঙ্কের ঘটনা বিরল হওয়ায় বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করেন, আক্রান্ত সিলটি হয়তো ভাইরাসটির বাহক ছিল।

এরপর কয়েকটি সিলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। চারটি সিলের মধ্যে তিনটির শরীরে জলাতঙ্কের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়, আর তিনটিই আগে অস্বাভাবিক আক্রমণাত্মক আচরণ করেছিল।

এরপর শুরু হয় পুরোনো নমুনা পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় ২০২৪ সাল থেকে কেপ অঞ্চলে সিলের মধ্যে ১০০টিরও বেশি জলাতঙ্কের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তবে ওই অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ সিলের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কত প্রাণী আক্রান্ত, তা এখনও জানা যায়নি। মৃত প্রাণীর মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করেই নিশ্চিতভাবে জলাতঙ্ক শনাক্ত করা সম্ভব হওয়ায় কাজটি অত্যন্ত কঠিন।

ভাইরাসটি এলো কোথা থেকে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— সিলের শরীরে জলাতঙ্কের ভাইরাস ঢুকল কীভাবে? প্রথমে গৃহপালিত কুকুরকে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু কেপ টাউনে কুকুরের মধ্যে জলাতঙ্কের সংক্রমণ না থাকায় সেই সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে যায়। তখন বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটির জেনেটিক গঠন বিশ্লেষণ শুরু করেন। জেনেটিক সিকোয়েন্সিং ও ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা ভাইরাসটির বিবর্তনীয় সম্পর্ক অনুসরণ করেন।

এই বিশ্লেষণ তাদের নিয়ে যায় ব্ল্যাক-ব্যাকড জ্যাকাল বা কালো-পিঠের শিয়ালের কাছে— দক্ষিণ আফ্রিকায় জলাতঙ্ক বহনকারী হিসেবে পরিচিত একটি প্রাণী। এই শিয়ালগুলো সিলের উপনিবেশের কাছাকাছি বিচরণ করে। তারা সিলের বাচ্চা শিকার করতে পারে এবং মৃত সিলের দেহ থেকেও খাবার সংগ্রহ করে। ফলে কোনো সংঘর্ষের সময় কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাসটি শিয়াল থেকে সিলে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, জেনেটিক বিশ্লেষণ বলছে সিলের জনসংখ্যায় ভাইরাসটি সম্ভবত ২০১৫ সালের দিকেই প্রবেশ করেছিল। অর্থাৎ মানুষ যখন অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করতে শুরু করে, তার অনেক বছর আগেই ভাইরাসটি সিলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল।

দুই মিলিয়ন সিলকে টিকা দেওয়া কি সম্ভব?
ভাইরাসের উৎস শনাক্ত হলেও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা। বিশেষজ্ঞরা কিছু মানুষের সংস্পর্শে অভ্যস্ত সিলকে টিকা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি জলাতঙ্কে আক্রান্ত বা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এমন কিছু প্রাণীকে মেরে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু পুরো অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ কেপ ফার সিলকে টিকা দেওয়া বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। একটি প্রাণীকে টিকা দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বুস্টার ডোজও প্রয়োজন। কিন্তু বিশাল সিলের উপনিবেশে কোনো প্রাণীকে কখন টিকা দেওয়া হয়েছে, তা শনাক্ত করে আবার একই প্রাণীকে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব।

সিলের খাবারের অভ্যাসও আরেকটি সমস্যা। অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ানোর টিকা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সিল শিকারকে জীবন্ত অবস্থায় খেয়ে ফেলে। ফলে টিকা মেশানো খাবার নিরাপদ ও কার্যকরভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া কঠিন।

সিলের জীবনযাপনই কি ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ বাড়াচ্ছে?
কেপ ফার সিল অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। তারা বিপুল সংখ্যায় একসঙ্গে বসবাস করে এবং এক উপনিবেশ থেকে অন্য উপনিবেশে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে। একটি সিল দিনে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সাঁতার কাটতে পারে। ফলে আক্রান্ত একটি প্রাণী খুব সহজেই ভাইরাসকে অন্য এলাকায় নিয়ে যেতে পারে।

এ কারণেই বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রোগটি এখন কেপ ফার সিলের মধ্যে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ একে পুরোপুরি নির্মূল করার বদলে আপাতত নিয়ন্ত্রণে রাখাই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।


মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকি?
বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়। আক্রান্ত প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া হলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু একবার রোগের উপসর্গ দেখা দিলে এটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে সিলের কামড়ের ঘটনাও ঘটছে।

২০২২ সালের জুলাইয়ে সেখানে মানুষের ওপর সিলের প্রথম নিশ্চিত আক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এরপরও একের পর এক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের এক দিনেই মুইজেনবার্গ বিচে জলাতঙ্কে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা একটি সিল নয়জনকে কামড় দেয়; তাদের মধ্যে ছয়জন ছিল শিশু। এখন পর্যন্ত সিলের কামড়ের প্রায় ১৭৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষকরা জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত সিল থেকে মানুষের মধ্যে জলাতঙ্ক সংক্রমণের কোনো ঘটনা নিশ্চিত হয়নি। 

সমুদ্র থেকে দূরে নয়, দূরত্ব বজায় রাখাই সমাধান
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনায় মানুষের আতঙ্কিত হয়ে সমুদ্র বা সৈকত এড়িয়ে চলার প্রয়োজন নেই। বরং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণকে সম্মান করা এবং তাদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত সিলের আচরণে কয়েকটি অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা যেতে পারে— হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা, পানিতে ফিরে যেতে না চাওয়া কিংবা মাথা অদ্ভুতভাবে ঝাঁকানো। এ ধরনের কোনো আচরণ দেখলে প্রাণীটির কাছে যাওয়া উচিত নয়। বরং পানি বা সৈকত থেকে সরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই নিরাপদ।

সিলের শরীরে জলাতঙ্কের এই বিস্তার বিজ্ঞানীদের জন্য যেমন নতুন এক বৈজ্ঞানিক ধাঁধা, তেমনি এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে— বন্যপ্রাণী ও মানুষের জগত যত কাছাকাছি আসছে, প্রাণীর রোগ কীভাবে নতুন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেই প্রশ্নও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   সাগর  জলাতঙ্ক  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: