তিনি এলাকার মাতবর। তার কথা মানা ছাড়া উপায় নেই এলাকাবাসীর। ওই মাতবরকে স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণে অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। এ ‘অপরাধে’ তার এলাকার অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থীর স্কুলে আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ভাষানচর ইউনিয়নের চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে তাদের নির্মাণকাজ উদ্বোধনের বিষয়টি জানায়। ফলে অনুষ্ঠানে কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ পাননি তারা ।
অভিযোগ রয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় প্রভাবশালী মাতবর কামরুল হাসান। তিনি স্থানীয় অভিভাবকদের নিয়ে একটি সভা করে শিক্ষার্থীদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার জন্য বলেন।
মাতবর কামরুল হাসান (৪৩) ভাষানচর ইউনিয়নের নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দুই নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তার বাবা মৃত আবুল কালাম ভাষানচর ইউপির দুই নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।
নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে প্রায় ৩০ শিক্ষার্থী চারদিন ধরে বিদ্যালয়ে আসছে না বলে জানা গেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী কামরুল হাসানের নির্দেশের পর অভিভাবকেরা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না বলেও জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক।
১৯৮৭ সালে ৩৩ শতাংশ জমির উপর চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়। এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে চারজন শিক্ষক ও ১০৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভবন উদ্বোধনের আগে নিয়মিত ৬৫ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকত। তবে গত চার দিন ধরে বিদ্যালয়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের মতো শিক্ষার্থী উপস্থিত হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কামরুল হাসানকে দাওয়াত না দেওয়াকে কেন্দ্র করে তিনি ক্ষুব্ধ হন। পরে এলাকায় অভিভাবকদের নিয়ে সভা করে তাদের সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার কথা বলেন। তাঁর প্রভাবের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কেউ আশপাশের বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করানোর চেষ্টা করছেন।
অভিভাবকেরা আরও বলেন, এভাবে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বিষয়টির দ্রুত সমাধান চান তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি বিদ্যালয় থেকে এভাবে দলবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় শিক্ষা কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজ বলেন, হঠাৎ করে এতসংখ্যক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে না আসায় স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) পাঁচ-ছয় জন শিক্ষার্থী টিসি নিয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আলী খান বলেন, ভবনের নির্মাণকাজের উদ্বোধনের বিষয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে আমাদের জানায়। ফলে আমরা কাউকে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ পাইনি। বিষয়টি আমি কামরুল হাসানকে বুঝিয়ে বলেছি। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শোনেননি। তিনি ২৮ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৮-৯ সময় স্থানীয় অভিভাবকদের নিয়ে তার বাড়ির পাশের নুর ইসলামের চায়ের দোকানে শিক্ষার্থীদের এই স্কুল থেকে সরিয়ে নিতে মিটিং করেন।
পার্শ্ববর্তী চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভগিরত সাহা জানান, ওই বিদ্যালয় থেকে এ পর্যন্ত ২৫- ২৭ জন শিক্ষার্থী তাদের অভিভাবকদের সাথে তাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসেছিল। তবে টিসি না থাকায় কাউকে ভর্তি করা হয় নাই।
এ বিদ্যালয়টি ভাষানচর ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। ওই ওয়ার্ডের বর্তমান সদস্য মো. ফরিদ হোসেন। তিনি বলেন, কামরুল হাসান নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী এলাকার মাতুব্বর। তিনিই ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন।
ভাষানচর ইউপি চেয়ারম্যান মো. গোলাম কাওসার বলেন, স্কুলে কোলচুরী এলাকার শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে না এ বিষয়টি তিনি জেনেছেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে তনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
অভিযোগের বিষয়ে কামরুল হাসান বলেন, তার বাড়ি ওই এলাকায় হলেও তিনি ফরিদপুর শহরে থাকেন সরকারি চাকুরির সুবাদে। তিনি বলেন, তে ওই বিদ্যালয় পড়াশোনা হয় না বলে হয়তো অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অন্য স্কুলে ভর্তি করতে চাইছেন। এ ব্যাপারে এলাকার মাতবর হিসেবে তার নাম আসার বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ হয়ত শত্রুতা করে এ কথা বলছে। অথচ এ বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।
সদরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/আতা