ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় হালকা কুয়াশার আবরণ। মহানন্দা নদীর তীরে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে অপেক্ষমাণ শত শত মানুষের চোখ নিবদ্ধ দিগন্তের নীল সীমানায়। হঠাৎ করেই যেন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় মেঘের পর্দা সরে গেল। আর ঠিক তখনই দৃশ্যমান হলো তুষারশুভ্র এক বিশাল পর্বতশৃঙ্গ, কাঞ্চনজঙ্ঘা। সূর্যের প্রথম রশ্মি যখন সেই বরফ চূড়ায় আছড়ে পড়ল, মুহূর্তেই রুপালি পাহাড়টি ধারণ করল কাঁচা সোনার রং। এ যেন কোনো শিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস! উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে এখন খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা।
পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই এক অভাবনীয় ভ্রমণ : সৌন্দর্যের মায়ারূপে বিশ্বের তৃতীয় সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পর্যটকরা সাধারণত ছোটেন ভারতের সিকিম কিংবা নেপালের তাপ্লেজুংয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিনা পাসপোর্ট-ভিসায় ভিনদেশের এই পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যেন এক পরম ভাগ্যের ব্যাপার। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরের ‘হিমালয় কন্যা’ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাই মেলা বসে পর্যটকদের।
মেঘ-রোদের লুকোচুরি ও রঙের জাদু : কাঞ্চনজঙ্ঘা সবসময় দেখা দেয় না। বর্ষার শেষে শরতের নীল আকাশে মেঘের ঘনঘটা কাটলেই উঁকি দেয় এই শ্বেতশুভ্র মহানায়ক। স্থানীয়দের কাছে এটি প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য হলেও পর্যটকদের কাছে এটি এক সৌন্দর্যের ম্যাজিক। মেঘের কোলে রোদ-কুয়াশার সঙ্গে খেলতে খেলতে পর্বতটি প্রথমে কালচে, এরপর ক্রমান্বয়ে লাল টকটকে, কমলা, হলুদ এবং শেষে ধবধবে সাদা রং ধারণ করে। ভোরের প্রথম কিরণ যখন চূড়া স্পর্শ করে, তখন মনে হয় পর্বতটি যেন উত্তপ্ত লাভার মতো জ্বলছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও প্রত্যাশা : তেঁতুলিয়া ভ্রমণে আসা পর্যটকরা জানান, আতিথেয়তা ও শান্ত পরিবেশের জন্য এ অঞ্চলটি অনন্য। তবে পর্যটন সুবিধার জন্য এখানে আরও বড় আকারের বিনোদনকেন্দ্র বা থিম পার্ক তৈরির দাবি জানিয়েছেন তারা। ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল মতিন বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছি। বিলবোর্ডের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেকোনো প্রয়োজনে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। তেঁতুলিয়া ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সম্পাদক রনি মিয়াজী বলেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা ঘিরে তেঁতুলিয়ায় এখন উৎসবের আমেজ। আমরা পর্যটকদের বিনোদনের জন্য স্থানীয় লোকজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও করছি।
কতটা কাছে এই পর্বত : ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সরাসরি দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। যে কারণে এখান থেকে হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া যতটা স্পষ্ট দেখা যায়, তা ভারতের শিলিগুড়ি থেকেও সম্ভব নয়। তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা থেকে নেপালের দূরত্ব ৬১ কিলোমিটার এবং ভুটান মাত্র ৬৪ কিলোমিটার দূরে। এমন চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তেঁতুলিয়া এখন দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।
রাতের মায়া ও ভারতীয় শহরের আলোকচ্ছটা : দিনের কাঞ্চনজঙ্ঘা যেমন বিমোহিত করে, রাতের তেঁতুলিয়াও ঠিক তেমনি রহস্যময়। মেঘমুক্ত রাতের আকাশে ডাকবাংলোর তীর থেকে স্পষ্ট দেখা যায় ভারতের কালিম্পং ও দার্জিলিং শহরের বৈদ্যুতিক আলো। আরও দেখা যায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সার্চলাইটের ঝলকানি। সমতলের চা বাগানের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মহানন্দার চরে দাঁড়ালে মনে হয় যেন অন্য কোনো এক জগত!
বদলে যাওয়া অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্প : কাঞ্চনজঙ্ঘাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে পঞ্চগড়ের অর্থনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তেঁতুলিয়ার গ্রামগুলো এখন আর অবহেলিত জনপদ নয়, বরং একেকটি সমতলের চা বাগানঘেরা পর্যটনকেন্দ্র। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও’র ইকো ট্যুরিজম প্রকল্পের আওতায় দর্জিপাড়ায় ভিনদেশি টিউলিপ চাষ এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। পর্যটকদের আবাসন সুবিধার জন্য গড়ে উঠেছে ইকো মহানন্দা কটেজ, গ্রিন টি ভ্যালি রিসোর্ট, মেঘালয় রিসোর্ট ও মেঘকুঞ্জের মতো আধুনিক থাকার জায়গা। আর খাবারের স্বাদ দিতে প্রস্তুত রয়েছে ভোজনবাড়ী, জান্নাত ও শখের হাঁড়ি রেস্তোরাঁসহ বাংলা হোটেলের মতো বিভিন্ন ঘরোয়া হোটেল। পর্যটন মৌসুমে ব্যস্ত সময় পার করেন স্থানীয় ভ্যান ও অটোচালকরাও।
শরত আর হেমন্তের সন্ধিক্ষণে তেঁতুলিয়া এখন ডানা মেলা স্বপ্নের নাম। মেঘের পর্দা সরলেই যেখানে জেগে ওঠে প্রকৃতির পরম বিস্ময় কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর তাই তো কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী হাসি দেখতে দলে দলে পর্যটকরা ছুটছেন পঞ্চগড়ে।
সময়ের আলো/আতা