শারদ উৎসবে রঙিন পালপাড়া

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

শরতের ধোয়া নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর পাড়ে কাশফুলের দোল। শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা পৌঁছে গেছে উত্তরের জেলা গাইবান্ধার

2026-10-05T18:02:04+00:00
2026-10-05T18:05:04+00:00
 
  সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬,
২০ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
শারদ উৎসবে রঙিন পালপাড়া
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০২ পিএম  আপডেট: ০৫.১০.২০২৬ ৬:০৫ পিএম
মাটির পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করেন কারিগর ও তাঁদের পরিবারের নারীরা। ছবি : সময়ের আলো
শরতের ধোয়া নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর পাড়ে কাশফুলের দোল। শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা পৌঁছে গেছে উত্তরের জেলা গাইবান্ধার গ্রামে গ্রামে। এবার জেলার সাত উপজেলায় ৬২৯টি মন্দির ও মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। মহালয়ার পর থেকেই প্রতিটি মণ্ডপ ঘিরে শুরু হয়েছে মেলার প্রস্তুতি। আর সেই মেলার প্রাণ যাঁদের হাতে গড়া, তাঁরা হলেন বাদিয়াখালী ইউনিয়নের পালপাড়া ও শহরের কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।

পালপাড়ায় পা রাখলেই নাকে আসে কাঁচা মাটির সোঁদা গন্ধ। উঠোনজুড়ে সারি সারি শুকাতে দেওয়া হাতি, ঘোড়া, ময়ূর আর পুতুল। একটি রূপহীন মাটির পিণ্ড অনেক ধাপ পেরিয়ে হয়ে ওঠে জীবন্ত খেলনা। প্রতিটি ধাপেই মিশে থাকে শ্রম, দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা।

উৎসবের কয়েক মাস আগে থেকেই নদী ও বিলের তলদেশ থেকে সংগ্রহ করা হয় বিশেষ এঁটেল মাটি। রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর কারিগররা পা দিয়ে ছেনে সেই মাটিকে নরম ও মসৃণ করে তোলেন। কাঠ বা পোড়ামাটির ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হয় নানা আকৃতির খেলনা ও পণ্য। সেগুলো রোদে শুকিয়ে ইট ও তুষ দিয়ে তৈরি ভাটায় উচ্চ তাপে পোড়ানো হয়।

এরপর শুরু হয় সবচেয়ে মনোহর অধ্যায়—রং করা। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ ও সাদা রঙের তুলির আঁচড়ে মাটির পুতুলে প্রাণ সঞ্চার করেন কারিগর ও তাঁদের পরিবারের নারীরা।

এবার গাইবান্ধার কারিগররা প্রায় ৫০ ধরনের মাটির পণ্য তৈরি করছেন। এর মধ্যে রয়েছে মাটির ব্যাংক, হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, হাতি, ঘোড়া, পাখি, ময়ূর, বাঘ এবং আপেল, আম, কাঁঠালের মতো বিভিন্ন ফলের প্রতিকৃতি।

বাদিয়াখালী পালপাড়ার যোগেন পালের বয়স ৪০ বছর। তাঁর পূর্বপুরুষেরা শত বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। তাঁর বাবা টানা ৬০ বছর মাটি ঘেঁটে জীবন কাটিয়েছেন। যোগেনও ছোটবেলা থেকে আঁকড়ে আছেন বাপ-দাদার এই ঐতিহ্য। স্ত্রী সবিতা পালকে নিয়ে এখন তিনি দিনরাত পণ্য পোড়ানো ও রং করার কাজে ব্যস্ত।

সবিতা পাল বলেন, উৎসবের আগের দিনগুলোতে তাঁদের দম ফেলার সময় থাকে না। মণ্ডপসংলগ্ন মেলায় পসরা সাজাতে হলে সময়মতো পণ্য তৈরি শেষ করতে হয়। শহরের কুমারপাড়ায় প্রবীণ শিল্পী পিযুষ পাল, বিমল পাল ও অবিনাশ পালের উঠোনেও দেখা গেছে একই ব্যস্ততার চিত্র।


পূজার সময়টা প্রান্তিক এই শিল্পীদের কাছে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। উৎসবের বেশ কিছুদিন আগেই জেলা ও আশপাশের খুচরা বিক্রেতা এবং পাইকাররা পালপাড়ায় এসে অগ্রিম পাইকারি দামে পণ্যের বায়না দেন। একসঙ্গে অনেক পণ্য বিক্রি হওয়ায় ঘরে আসে কিছুটা এককালীন অর্থ।

তবে অনেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে পণ্য না দিয়ে নিজেরাই মেলায় অস্থায়ী স্টল সাজিয়ে বসেন। যোগেন ও সবিতা পাল তাঁদেরই একজন। খুচরা বিক্রি করলে প্রতি পিস খেলনায় গড়ে লাভ থাকে মাত্র ২ টাকার মতো।

বছরের বাকি সময় এই কারিগরদের বেশির ভাগই দইয়ের সরা, পাতিল কিংবা ফুলের টব তৈরি করে কোনোমতে সংসার চালান। দুর্গাপূজা ও পরের কালীপূজা—এই দুই মাসের বাড়তি আয় দিয়েই বছরের বাকি পাঁচ-ছয় মাসের খরচ সামলান তাঁরা। ফলে উৎসব তাঁদের কাছে কেবল আনন্দের নয়, টিকে থাকারও উপলক্ষ।

রঙিন পুতুলের ক্যানভাসের আড়ালে রয়েছে গভীর সংকটও। প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের সস্তা, হালকা ও না-ভাঙা খেলনা বাজার দখল করে নিয়েছে। শিশুরাও এখন মাটির খেলনার চেয়ে প্লাস্টিকের খেলনার দিকেই বেশি ঝুঁকছে। এতে মাটির খেলনার চিরচেনা কদর কমেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি। মাটি, তুষ ও কাঠের দাম বেড়েছে, বেড়েছে পরিবহন খরচও। অথচ খেলনার বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। শ্রমের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় নতুন প্রজন্মও বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য কাজের খোঁজে যাচ্ছে।


ছবিটা শুধু গাইবান্ধার নয়। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের পালপাড়ায় পুরুষেরা পর্যাপ্ত মুনাফা না পেয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। এখন নারীরাই কোনোমতে প্রাচীন এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

মাটির খেলনার গুরুত্ব কেবল টাকার অঙ্কে মাপা যায় না। লোকশিল্প গবেষকদের মতে, কাঁচা মাটি পুড়িয়ে রং মাখানোর এই শিল্প বাঙালির সুপ্রাচীন নান্দনিক চেতনার প্রতীক।

গাইবান্ধা জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজন প্রসাদ বলেন, মৃৎশিল্প গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৈশাখী মেলা, দুর্গোৎসব কিংবা অন্য যেকোনো পার্বণে মাটির জিনিসের আবেদন কখনো পুরোনো হয় না।

স্থানীয় শিক্ষক তপন রায় বলেন, মেলায় আধুনিক প্রসাধনী, প্লাস্টিক বা কাঠের খেলনার দোকান থাকলেও দর্শনার্থী ও অভিভাবকদের আকর্ষণ থাকে মাটির খেলনার স্টলেই। এতে শিশুরা ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়, পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণও কমে। মাটির খেলনা মাটি থেকে এসে মাটিতেই মিশে যায়, আর প্লাস্টিক যুগের পর যুগ পরিবেশের ক্ষতি করে।


শতবর্ষের এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জরুরি। শুধু ঐতিহ্যপ্রীতি দিয়ে বাজারের বৈষম্য ঘোচানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক অর্থায়ন ও বিপণন কাঠামো।

প্রথমত, মহাজনি ঋণের জাল থেকে বের করতে বিসিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে জামানতবিহীন স্বল্প সুদের ঋণ দেওয়া দরকার। বিসিক গাইবান্ধার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রান্তিক মৃৎশিল্পীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আবেদন করলে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে সহায়তা পেতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক নকশার প্রশিক্ষণ দরকার। শহুরে ও আন্তর্জাতিক বাজারে টেরাকোটা, পোড়ামাটির গয়না ও গৃহসজ্জার সামগ্রীর চাহিদা বাড়ছে। ঐতিহ্যবাহী খেলনার পাশাপাশি গাইবান্ধার শিল্পীদের এসব পণ্য তৈরিতে দক্ষ করে তোলা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, জাতীয় পর্যায়ের প্রদর্শনী ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সরাসরি বিক্রির সুযোগ করে দিতে হবে। বিসিকের শরৎ মেলা বা বৈশাখী মেলায় কারিগরদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ কমবে, মিলবে ন্যায্য দাম। পাশাপাশি মেলায় প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে মাটির পণ্যে প্রণোদনা দেওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে।

মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর মূর্তিতে আর মেলার প্রাঙ্গণে রঙিন খেলনার সারিতে মিশে আছে গাইবান্ধার পালপাড়ার মানুষের ঘাম ও স্বপ্ন। যোগেন, সবিতা কিংবা বিমল পালদের হাত ধরে যে লোকঐতিহ্য আজও টিকে আছে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক বাজারের ছোঁয়া পেলে তা আবার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। মাটির এই শিল্প বাঁচানো মানে বাংলার শতবর্ষের পরিচয় ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের জন্য বাঁচিয়ে রাখা।

সময়ের আলো/এনএন
  বিষয়:   শারদ উৎসব  রঙিন পালপাড়া  গাইবান্ধা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: