হাজারো সাধারণ বাড়িতে বসানো ব্যাটারি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎসগুলোর একটি। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় এসব ব্যাটারি বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। একই সঙ্গে হাজারো ব্যাটারি একত্রে মিলে তৈরি করেছে ‘ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্ট’— যা প্রয়োজনের সময় প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে পারে।
গত কয়েক দশকে ভারমন্টে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অঙ্গরাজ্যটির ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতিসাধনকারী কিছু ঝড়। পূর্ব ভারমন্টের গ্রামীণ শহর স্প্রিংফিল্ডে স্বামী অ্যান্ডি ও পোষা কুকুরের সঙ্গে থাকেন পলিয়ানা ব্লাডাইকা। তার অভিজ্ঞতায়, এসব দুর্যোগের অর্থবছরে প্রায় এক ডজনবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, কখনো টানা কয়েক ঘণ্টার জন্য।
ব্লাডাইকা বলেন, ‘আমি শুধু সকালে এক কাপ কফি খেতে চাই, আর খবর দেখতে চাই,’
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিরক্ত হয়ে ২০২৪ সালে তিনি গ্যাসচালিত জেনারেটর কেনার প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন। তার অনেক প্রতিবেশীও এরই মধ্যে এমন জেনারেটর কিনেছিলেন। কিন্তু জেনারেটর বসানোর জন্য যে ইলেকট্রিশিয়ানকে তিনি নিয়োগ করেছিলেন, তিনিই তাকে বিকল্প একটি ব্যবস্থার কথা জানান।
ভারমন্টের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্রিন মাউন্টেন পাওয়ার (জিএমপি) পরিচালিত ওই প্রকল্পে অংশ নেওয়া বাড়িতে দুটি করে ব্যাটারি বসানো হয়। ১০ বছরের লিজ চুক্তিতে এর জন্য মাসে ৫৫ ডলার দিতে হয়। খোঁজখবর নিয়ে ব্লাডাইকা ও তার স্বামী সিদ্ধান্ত নেন, ১২ হাজার ডলার খরচ করে জেনারেটর কেনার চেয়ে এই ব্যবস্থাই ভালো। ২০২৪ সালে ব্যাটারি বসানোর পর থেকে একবারও তাদের বিদ্যুৎ যায়নি।
ব্লাডাইকা বলেন, ‘আমি বলতে চাই, পরিবেশের জন্য করেছি; কিন্তু আসলে নিজের জন্যই করেছি। তবে অন্যদের সাহায্য করতে আমার আপত্তি নেই।’
ভারমন্টে এ ধরনের বাড়ির ব্যাটারি ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় এগুলো যেমন ব্যক্তিগত বাড়িকে সুরক্ষা দেয়, তেমনি হাজারো ব্যাটারি একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে নতুন ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র— ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্ট।
ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্টে বাড়ির ব্যাটারি, ছাদের সৌর প্যানেল, স্মার্ট থার্মোস্ট্যাট কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির মতো ছোট ছোট যন্ত্রকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়। প্রয়োজনের সময় এসব যন্ত্র থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া বা ব্যবহার কমিয়ে গ্রিডের ওপর চাপ কমানো যায়। ফলে হাজারো ছোট উৎস মিলে বড় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো কাজ করতে পারে।
উড ম্যাকেঞ্জির অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এখন ৪০ গিগাওয়াটের বেশি ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্ট সক্ষমতা রয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক প্রায় ৬০০ গিগাওয়াট এবং কয়লাভিত্তিক ২০০ গিগাওয়াট সক্ষমতার তুলনায় এটি এখনও ছোট। তবে ২০২৫ সালের মার্কিন জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্ট থেকে ১৬০ গিগাওয়াট পর্যন্ত সক্ষমতা পাওয়া সম্ভব হতে পারে। এই পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশের সমান।
জিএমপির প্রকল্পের মাধ্যমে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্টটি ধীরে ধীরে ভারমন্টের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হয়েছে। এখন অঙ্গরাজ্যটি পরীক্ষা করে দেখছে, এই ‘অদৃশ্য’ বিদ্যুৎব্যবস্থার পরিধি আরও কতটা বাড়ানো যায়।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিরুদ্ধে সুরক্ষা : বিদ্যুৎ বিভ্রাট এড়ানোই ছিল ব্লাডাইকার ব্যাটারি নেওয়ার প্রধান কারণ। ২০২৬ সালের মে মাসে নিজের বাড়িতে গিয়ে তিনি বলেন, আগে বছরে বেশ কয়েকবার ঘুম থেকে উঠে দেখতেন বিদ্যুৎ নেই। এতে সকালের স্বাভাবিক কাজকর্মও ব্যাহত হতো। তার মতে, ঝড়ই ছিল বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।
এই ব্যাটারি ব্যবস্থায় এখন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি খুব একটা চিন্তা করেন না। তার বাড়ির ব্যাটারি প্রায় দুদিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ দিতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় চালাতে হলে বাসন ধোয়া বা কাপড় ধোয়ার মতো অপেক্ষাকৃত বেশি বিদ্যুৎ খরচের কাজ কমাতে হয়।
উত্তর ভারমন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকেন মেগান ব্রাউনিং। প্রায় এক বছর ধরে তিনি জিএমপির প্রকল্পের আওতায় দুটি বাড়ির ব্যাটারি ও ছাদের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। এই সময়ে তার একবারও বিদ্যুৎ যায়নি। সম্প্রতি একটি শক্তিশালী ঝড়ে তার বাড়ির কাছে বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে আশপাশের অনেক বাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে গেলেও তিনি বলেন, ‘আমি এক ঝলক আলোও নিভতে দেখিনি।’
ভারমন্টের গ্রাহকদের মধ্যে এই ব্যবস্থার আগ্রহ দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালে অঙ্গরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রকল্পে অংশগ্রহণের সীমা তুলে দেওয়ার পর জিএমপির ব্যাটারি লিজ কর্মসূচিতে বড় সাড়া পড়ে। এরপর থেকে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ এতে যুক্ত হয়েছেন।
ভারমন্টের ৭৫ শতাংশের বেশি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে জিএমপি। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট বন্ধ করা। বাড়ির ব্যাটারি কর্মসূচি সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন মাটির নিচে নেওয়ার মতো ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটপ্রবণ গ্রামীণ এলাকায় ব্যাটারি ব্যবস্থাকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে জিএমপি যে হাজারো গ্রাহককে বিনামূল্যে ব্যাটারি দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে।
ভার্চুয়াল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উত্থান : যুক্তরাষ্ট্রে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্টের ধারণা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, ছাদের সৌরবিদ্যুতের বিস্তার এবং বড় ব্যাটারি ব্যবহারের কারণে এ ধরনের প্রকল্প বাড়ছে। জার্মানি ও চীনসহ বিভিন্ন দেশেও এখন একই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠছে।
জিএমপির কর্মসূচি ২০১৭ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়। দ্য ব্র্যাটল গ্রুপের ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্ট বিশেষজ্ঞ কেট পিটার্সের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যাটারি প্রকল্পগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন হলে জিএমপি ব্লাডাইকার ব্যাটারিসহ প্রকল্পের আওতায় থাকা অন্য ব্যাটারিগুলোও গ্রিডে কাজে লাগাতে পারে। তবে গ্রাহকদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য কিছু বিদ্যুৎ মজুদ রাখার সুযোগ থাকে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়।
বর্তমানে এই কর্মসূচি প্রায় ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। এটি ছোট থেকে মাঝারি আকারের একটি প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার কাছাকাছি এবং ভারমন্টের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎস। তবে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্ট নিজে বিদ্যুৎ তৈরি করে না। এর সঙ্গে যুক্ত সৌর প্যানেলসহ অন্য উৎস বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, আর ভার্চুয়াল ব্যবস্থা প্রয়োজনের সময় সেই বিদ্যুৎ সঠিক জায়গায় কাজে লাগাতে সাহায্য করে। জিএমপির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িতে ছাদের সৌর প্যানেলও রয়েছে।
ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্টের বড় একটি সুবিধা হলো সর্বোচ্চ চাহিদার সময় প্রচলিত ‘পিকার প্লান্ট’-এর ওপর নির্ভরতা কমানো। এসব পিকার প্লান্ট সাধারণত বছরের অল্প কয়েকটি দিনে, যখন বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন চালু করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো তেল, ডিজেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসে চলে। ফলে ব্যয়ও বেশি, পরিবেশের ওপর চাপও বেশি।
জিএমপির প্রধান নির্বাহী মেরি ম্যাকক্লুরের মতে, ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্ট তাদের কিছু পুরোনো পিকার প্লান্টের জায়গা নিতে পেরেছে। অল্প সময়ের জন্য আঞ্চলিক নিউ ইংল্যান্ড গ্রিড অপারেটরের বিশেষ চাহিদায় চারটি পিকার প্লান্ট এখনও চালু করা হয়, তবে সেগুলোও ভবিষ্যতে বন্ধ করার আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
জিএমপির তথ্য অনুযায়ী, তাদের ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্ট গত বছর গ্রাহকদের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ডলার সাশ্রয় করেছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ব্যবস্থা বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সাশ্রয় করতে পারে।
তবে এই মডেলের সামনে বাধাও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা জেন ডাউনিং বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন অবকাঠামো তৈরি করলে যে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়, ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্টে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সেই প্রণোদনা সবসময় থাকে না। এ ছাড়া গ্রাহকদের শুরুতে যুক্ত করার খরচ এবং পাইকারি বিদ্যুৎবাজারের সঙ্গে এই ব্যবস্থাকে সমন্বয় করাও জটিল।
তারপরও ম্যাসাচুসেটস, ইলিনয় ও নিউ জার্সির মতো অঙ্গরাজ্যগুলো এ ধরনের ব্যবস্থা বাড়াতে উৎসাহ দিচ্ছে। কারণ এতে বিদ্যুৎ খরচ কমানো, গ্রিডের চাপ সামলানো এবং নতুন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন কমানো সম্ভব হতে পারে।
জিএমপির পরিকল্পনা, আগামী কয়েক বছরে তাদের প্রায় ৩ লাখ গ্রাহকের যারা চাইবেন, তাদের বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের ব্যবস্থা দেওয়ার। ২০৩৪ সালের মধ্যে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্লান্টের আকার দ্বিগুণেরও বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিকেও ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে তৈরি হতে পারে আরও বড় ‘ভেহিকল-টু-গ্রিড’ ব্যবস্থা।
এই ধারণার মূল কথাটা সহজ— একটি বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সবসময় একটি জায়গায় থাকতেই হবে এমন নয়। হাজার হাজার বাড়ির ব্যাটারি, সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক গাড়ি একসঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রয়োজনের সময় একই কাজ করতে পারে। ম্যাকক্লুরের ভাষায়, গ্রাহকরা তখন শুধু বিদ্যুতের ভোক্তা নন, একই সঙ্গে বিদ্যুতের উৎপাদক ও গ্রিডের অংশীদারও হয়ে উঠবেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা