ইলিশের প্রজনন মৌসুমের অবরোধ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নদী ও সাগরে কিছুটা ইলিশ ধরা পড়লেও জেলেদের মধ্যে কাটছে না হতাশা। দীর্ঘ কয়েক মাস নদী-সাগরে মাছ শিকার করেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ায় অনেক জেলে পড়েছেন ঋণের চাপে। এরই মধ্যে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে ইলিশের প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা। ফলে অবরোধের আগে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে স্থানীয় জেলেরা জানান, ইলিশ মৌসুমকে সামনে রেখে নৌকা, জাল, জ্বালানি, বরফ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। অনেকেই ধারদেনা করে এসব প্রস্তুতি নিয়ে নদী-সাগরে নামেন। কিন্তু কয়েক মাস মাছ শিকার করেও কাঙ্ক্ষিত আয় না হওয়ায় অনেকের ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে। শেষ সময়ে কিছুটা ইলিশ ধরা পড়লেও তা দিয়ে আগের লোকসান পুষিয়ে নেওয়া কঠিন বলে জানান তারা।
জেলে খোকন মাঝি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে ইলিশ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। এ বছরও ধারদেনা করে নৌকা নিয়ে নদীতে এসেছি। কিন্তু তেমন কোনো সুবিধা করতে পারিনি। বরং আরও ঋণের মধ্যে পড়ে গেছি। শেষ সময়ে কিছু মাছ পাওয়া গেলেও আগের ক্ষতি কতটা পুষিয়ে নিতে পারব, তা নিয়ে চিন্তায় আছি।’
শফি মাঝি বলেন, ‘আগে নদীতে প্রচুর ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছ অনেক কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি সাগরে অবৈধভাবে মাছ ধরার বড় ট্রলিং বোটের কার্যক্রমকে দায়ী করেন। তার অভিযোগ, এসব বোটের জালে ছোট-বড় অনেক মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী আটকা পড়ে। এতে নদী ও সাগরের মাছের প্রজনন ও স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
রফিক মাঝি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি মাছ ধরার পেশার সঙ্গে যুক্ত। ইচ্ছা থাকলেও সহজে এ পেশা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও মোটামুটি ভালো ছিলাম। এখন পরিস্থিতি অনেক কঠিন। একটি বড় বোট সাগরে নামানোর উপযোগী করতে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আর প্রতিটি ট্রিপে তেল, বরফ, খাবারসহ বাজার করতে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘একেকটি ট্রিপে ১০ থেকে ১৫ দিন সাগরে থাকতে হয়। অনেক সময় মাছের আয় দিয়ে শুধু বাজার খরচও ওঠে না। ভালো মাছ পাওয়ার আশায় বারবার সাগরে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে ঋণের পরিমাণও বাড়ছে।’
জেলে লোকমান মাঝি বলেন, ‘আগামী ৮ অক্টোবর থেকে অবরোধ শুরু হলে আমাদের জন্য ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ কমে যাবে। যদি আরও কয়েক দিন পরে অবরোধ দেওয়া হতো, তা হলে কিছুটা লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতাম। ২০ বা ২২ অক্টোবর থেকে অবরোধ শুরু হলেও জেলেরা কিছুটা স্বস্তি পেতেন বলে তিনি মনে করেন।’
এ বিষয়ে জানার জন্য চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ইলিশের প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে আগামী ৮ অক্টোবর থেকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এ সময় ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নদী ও সাগরে ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং এর সুফল জেলেদেরই ভোগ করতে হবে।
তবে জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পাশাপাশি অবৈধভাবে মাছ শিকারকারী ট্রলিং বোট ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা