উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র বগুড়ার সান্তাহার জংশন রেলওয়ে স্টেশন। ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৮ সালে পূর্ববঙ্গ রেলওয়ের অংশ হিসেবে ‘সুলতানপুর’ নামে এই স্টেশনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় সান্তাহার। বর্তমানে ৬টি প্ল্যাটফর্ম, ডুয়াল-গেজ ও মিটার-গেজ লাইনের এই স্টেশনটি দিয়ে প্রতিদিন আন্তঃনগর, মেইল ও মালবাহীসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৯টি ট্রেন যাতায়াত করে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী স্টেশনের দেড় শতাব্দীর পুরোনো ভবনগুলোর অধিকাংশই এখন ব্যবহার অনুপযোগী। চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চরম আতঙ্ক নিয়ে দাফতরিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যাত্রীদেরও বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্রামাগারসহ অন্যান্য স্থাপনা।
রেলওয়ের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৭৮ সালে কেবল ব্রডগেজ লাইন নিয়ে সান্তাহার স্টেশন নির্মিত হয়। এরপর ১৯০০ সালে সান্তাহার থেকে ফুলছড়ি পর্যন্ত মিটারগেজ লাইন নির্মাণের পর ১৯০১ সালে রেলপথটি চালু হলে স্টেশনটি জংশনে উন্নীত হয়। সে সময় রড-সিমেন্টের প্রচলন না থাকায় স্টেশনের দপ্তর, বিশ্রামাগার, গুদাম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো তৈরি করা হয়েছিল চুন-সুরকি দিয়ে। নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভবনগুলোয় বড় কোনো সংস্কার করা হয়নি। এমনকি ভবনের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও সেগুলোকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি।
স্টেশনে কর্মরত কয়েকজন রেলকর্মীর জানান, স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়, সহকারী স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিশ্রামাগার, মালামাল সংরক্ষণের গুদাম, রেলওয়ে থানা— এমনকি দুটি খাবারের হোটেলও পরিচালিত হচ্ছে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনে। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই তাদের সেখানে প্রতিদিন জীবনঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কখন ছাদের পলেস্তারা খসে পড়বে কিংবা পুরো ভবন ধসে পড়বে— এই শঙ্কা নিয়েই তাদের কাটাতে হয় প্রতিটা মুহূর্ত।
রেলওয়ে কর্মচারী আবদুল হান্নান শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
কর্মচারীদের পাশাপাশি চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদেরও। স্টেশনের প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগারে অবস্থানরত কয়েকজন যাত্রীর ভাষ্যমতে, এটি নামমাত্র বিশ্রামাগার হলেও সেখানে নিরাপদে বসার কোনো উপায় নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এছাড়া ভবনের বিভিন্ন জীর্ণ অংশে মাদকসেবী ও অপরাধীদের আনাগোনাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্প্রতি ছাদ দিয়ে পানি পড়া শুরু হলে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ (কার্য) থেকে সাময়িকভাবে কিছু অংশ সংস্কার করা হলেও এতে সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, নতুন কোনো পরিকল্পনার কারণে পুরোনো ভবনগুলো বড় পরিসরে সংস্কার করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে সান্তাহার রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (কার্য) আব্দুর রহমান জানান, সরকার দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন স্টেশনকে আইকনিক স্টেশনে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সেই তালিকার মধ্যেই রয়েছে সান্তাহার জংশন।
বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মহিত তালুকদার বলেন, পুরোনো এই ভবনগুলো ভেঙে সেখানে আধুনিক স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।
সময়ের আলো/আতা