হাজার স্মৃতি, অশ্রু আর সাফল্যের পথ পেরিয়ে অবশেষে থামল আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির পথচলা। ৩৯ বছর বয়সে এসে নীল-সাদা জার্সিতে ইতি টানলেন ফুটবলের এই কিংবদন্তি। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অসংখ্য অর্জন, রেকর্ড আর অবিস্মরণীয় মুহূর্তের পর বিদায় নিলেন আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।
শেষবার জাতীয় দলের অনুশীলন শেষে সতীর্থদের সঙ্গে তোলা কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন মেসি। সঙ্গে ছোট্ট বার্তা ‘আমি জানি এই বিশেষ মুহূর্তগুলো মিস করব।’ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে মেসির এই কথাতেই যেন ফুটে উঠেছে জাতীয় দলের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্কের আবেগ। শেষ অনুশীলনে সতীর্থদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মেসিকে দেখা গেছে। একটি ছবিতে ছিলেন পুরো স্কোয়াডের সদস্যরা।
সঙ্গে কোচিং স্টাফ, মাঠকর্মী ও আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারাও ছিলেন। সেখানে ছিলেন এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া। এজাইজা অনুশীলন কমপ্লেক্সে সেশন শেষে দলের সঙ্গে রাতের খাবারও সারেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে। অভিষেকটিও ছিল অদ্ভুত এক স্মৃতি। ৬৩ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে মাত্র ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে।
তবে সেই হতাশা পেছনে ফেলে দ্রুতই নিজের সামর্থ্যরে জানান দেন মেসি। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে করেন আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম গোল। এরপর বিশ্বকাপেও গোলের খাতা খোলেন। সার্বিয়ার বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে গোল করে জানান দেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চেও তিনি তৈরি।
এরপর অবশ্য সাফল্যের পাশাপাশি এসেছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও হতাশা। ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালেও জার্মানির কাছে হারতে হয়। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে আরও দুটি শিরোপা হাতছাড়া করেন মেসি।
অবশেষে ২০২১ সালে বদলে যায় গল্প। ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি পান মেসি। পরের বছর কাতারে আসে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তোলেন তিনি। এরপরও থামেননি মেসি। ২০২৪ সালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। আর ২০২৬ বিশ্বকাপেও শেষ পর্যন্ত ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায় দলটি। তবে স্পেনের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা।
এবার সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের শেষ ম্যাচ। বেনিনের বিপক্ষে মেসির সঙ্গে জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া নিকোলাস ওতামেন্দিও থাকছেন স্কোয়াডে। আছেন মেসির ইন্টার মায়ামির সতীর্থ রদ্রিগো দি পল ও জিওভানি লো সেলসোও। তবে কে কতক্ষণ খেলবেন, তা এখনও নিশ্চিত নয়। আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে কোনো সমস্যা না হলে পুরো ৯০ মিনিটই মাঠে থাকার কথা মেসির। অর্থাৎ জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো পূর্ণ একটি ম্যাচে তাকে দেখার সুযোগ পেতে পারেন সমর্থকরা।
মেসিকে বিদায় জানাতে মনুমেন্টালের গ্যালারি থাকবে কানায় কানায় পূর্ণ। থাকছে বিশেষ আয়োজন, অতিথি শিল্পীদের উপস্থিতি ও নানা চমক। সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত হতে পারে ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী দলের পুনর্মিলন। কাতারে মেসির সঙ্গে বিশ্বকাপ জেতা দলের প্রায় সব সদস্যই এই বিদায়ি আয়োজনে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
হাঙ্গেরির বিপক্ষে সেই অদ্ভুত অভিষেক থেকে শুরু করে হতাশার একের পর এক ফাইনাল, কোপা আমেরিকার শিরোপা, কাতারে বিশ্বকাপ জয় এবং সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপের রানার্সআপ। দুই দশকেরও বেশি সময়ের সেই গল্পের শেষ পৃষ্ঠা এখন সামনে। আজ ভোরে মনুমেন্টালের সব আলো তাই থাকবে একজনের ওপরই— লিওনেল মেসি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও