অনেক দিন আগের কথা। পর্তুগালের এক পর্যটক বেড়াতে গিয়েছিলেন লন্ডনে। ঘুরতে ঘুরতে এক দিন ঢুকে পড়লেন একটি বইয়ের দোকানে। বিশাল সেই বইয়ের ভান্ডারে কৌতূহলী চোখে খুঁজতে লাগলেন তার প্রিয় লেখকের একটি বই। অনেকক্ষণ হন্যে হয়ে খুঁজেও যখন বইটি পেলেন না, মনটা ভার হয়ে গেল তার। দোকান থেকে বেরিয়ে যাবেন, এমন সময় দৌড়ে এসে তার সামনে দাঁড়ালেন দোকানি।
কোন লেখকের বই খুঁজছেন?
বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে পর্যটক বললেন, ‘এত বড় দোকান, অথচ জেফ্রি আর্চারের বই নেই!’
দোকানি আর কোনো কথা না বলে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন দোকানের এক কোণে। তারপর আঙুল তুলে দেখালেন সেলফের এক কোণে পড়ে থাকা একটি বই। বইটি দেখেই পর্যটকের চোখেমুখে যেন আলো ফুটে উঠল। বইটির নাম ‘ক্যান অ্যান্ড অ্যাবেল’। আর এর লেখক জেফ্রি আর্চার— ইউরোপসহ বিশ্বের বহু দেশে যার নাম খ্যাতিমান লেখক হিসেবে পাঠকের কাছে অত্যন্ত পরিচিত।
গত সোমবার রাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন জেফ্রি আর্চার। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্তও তিনি লিখছিলেন। শেষ লেখার সময় কি তিনি জানতেন, পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে? সে উত্তর আর জানা যাবে না। তার মৃত্যুর খবর জানিয়েছে তার ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’ বইয়ের প্রকাশক হারপারকলিন্স। আশ্চর্যের বিষয়, বইটি তখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে প্রকাশক জানিয়েছেন, চলতি মাসেই প্রকাশিত হবে জেফ্রি আর্চারের শেষ লেখা বইটি।
দীর্ঘ ৮৬ বছরের জীবনে পাঁচ দশকের বেশি সময় লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিশ্বখ্যাত এই লেখক। তার বই অনূদিত হয়েছে ৪৯টি ভাষায় এবং ১১৯টি দেশে বিক্রি হয়েছে ৩০ কোটিরও বেশি কপি। বিপুল এই পাঠকপ্রিয়তা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া লেখকদের একজন করে তুলেছে। তার বইয়ের বিক্রির পরিমাণ ব্রিটেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখকদেরও বিস্মিত করেছে। এমনকি সাহিত্যে নোবেলজয়ী কোনো কোনো লেখকও তার লেখার জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনেছেন। অনেকের মতে, জেফ্রি আর্চারের লেখায় সমারসেট মমের লেখার ছায়া পাওয়া যায়। তবে জেফ্রি নিজেকে তুলনা করতেন নিজের সঙ্গেই।
জেফ্রি আর্চারের জন্ম উত্তর লন্ডনে, ১৯৪০ সালের ১৫ এপ্রিল। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি তার আগ্রহ ছিল। তবে লেখাই যে এক দিন তার জীবনের প্রধান সঙ্গী হয়ে উঠবে, তা হয়তো তখন তিনি নিজেও জানতেন না। লেখালেখির পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। সমাজের একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন মানুষ হিসেবে রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেন এবং পাঁচ বছর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কনজারভেটিভ এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে জীবনের কঠিন অধ্যায়ও আসে। ২০০১ সালে একটি মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার দায়ে তাকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে করা তারই একটি মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারাভোগের পর আর রাজনীতির পথে পা মাড়াননি জেফ্রি আর্চার। বরং লেখাকেই বেছে নেন তার ভাবনা ও সমাজকে দেখার প্রধান মাধ্যম হিসেবে। ২০০৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও অবশ্য তিনি পুরোপুরি জনজীবন থেকে সরে যাননি। ২০২৪ সালে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি হাউস অব লর্ডসের সদস্য ছিলেন।
জেফ্রি আর্চারের লেখায় ছিল এক ধরনের জাদু। তার গল্প পাঠককে খুব সহজেই টেনে নিয়ে যেত কাহিনির গভীরে, শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। তার বই দীর্ঘ সময় ধরে পাঠকের আগ্রহ ধরে রেখেছে। সানডে টাইমসের বেস্টসেলার তালিকায় তার বই ছিল টানা ১৪ বছর এবং নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার তালিকায় টানা পাঁচ বছর।
তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে— ‘ক্যান অ্যান্ড অ্যাবেল’, ‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’, ‘অ্যান্ড গেম’, ‘নট এ পেনি মোর, নট এ পেনি লেস’ এবং ‘দ্য সিনস অব দ্য ফাদার’। তার গল্পে রহস্য ও রোমাঞ্চ যেমন আছে, তেমনি আছে অজানাকে জানার এক অদম্য আকর্ষণ। ফলে একবার তার গল্পে ঢুকে পড়লে শেষ না করে উঠে আসা কঠিন।
‘অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ’-এর লেখার কাজ শেষ করেছিলেন জেফ্রি আর্চার। কিন্তু বইটির পুরোপুরি প্রকাশিত রূপ তিনি দেখে যেতে পারলেন না। প্রকাশক জানিয়েছেন, চলতি মাসেই বইটি পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরও নতুন একটি গল্প নিয়ে পাঠকের সামনে উপস্থিত হবেন তিনি।
তবে বইটির মলাট দেখে যেতে পারলেন না লেখক। টেবিলে বসে জীবনের যে শেষ লেখাটি লিখছিলেন, সেই লেখার ভবিষ্যৎও দেখে যেতে পারলেন না। তবে প্রকাশকের ভাষ্য অনুযায়ী সময়ই বলে দেবে বইটির ভবিষ্যৎ।
প্রকাশকের কথার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলা যায়, লেখক চলে গেলেন, থেকে গেল তার শব্দ। আর সেই শব্দই হয়তো বলে যাবে— একজন লেখকের জীবনের শেষ অধ্যায় শেষ হলেও তার গল্পের শেষ কখনো হয় না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি