নওগাঁয় দুই বছর ধরে আলু চাষ করে লোকসান গুনছেন কৃষকেরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় সেই লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাঁরা। এর মধ্যে এবার হিমাগার থেকে সংরক্ষিত আলু সংগ্রহ করতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কেজিপ্রতি দুই টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর বদলগাছীর উত্তরা কোল্ড স্টোরেজের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে পাহাড়পুর বাজারের সড়কে আলু ফেলে উত্তরা কোল্ড স্টোরেজের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন স্থানীয় কৃষকেরা।
এর আগে বুধবার বিকেলে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কেজিপ্রতি দুই টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি। এ সময় হিমাগার কর্তৃপক্ষকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
চলতি বছর ভালো দামের আশায় আলুর বীজ সংগ্রহ করছেন কৃষকেরা। এ কারণে বদলগাছীর উত্তরা কোল্ড স্টোরেজে এখন কৃষকদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। কেউ ট্রলি, কেউ ভ্যান আবার কেউ পরিবহন নিয়ে হিমাগারে আসছেন আলু নিতে। হিমাগার থেকে আলু নেওয়ার সময় অতিরিক্ত টাকা চাওয়ার অভিযোগে কয়েকজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, হিমাগার থেকে আলু বের করার সময় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কেজিপ্রতি অতিরিক্ত দুই টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে সংরক্ষিত আলুর পরিমাণ অনুযায়ী একেকজন কৃষককে অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। অনেক কৃষকের কয়েক শ বস্তা আলু সংরক্ষিত থাকায় বাড়তি অর্থের পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচের সঙ্গে হিমাগারে সংরক্ষণ ব্যয় যোগ হওয়ায় এমনিতেই আলু বিক্রি করে প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না। এর মধ্যে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে তাঁদের লোকসানের বোঝা আরও বাড়বে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বস্তায় গড়ে ৫০ কেজি আলু হিসাবে ১০০ বস্তায় ৫ হাজার কেজি আলু হয়। কেজিপ্রতি অতিরিক্ত দুই টাকা আদায় করা হলে একজন কৃষককে ১০ হাজার টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে। একইভাবে ৫০০ বস্তা আলুতে অতিরিক্ত খরচ দাঁড়ায় ৫০ হাজার টাকা। হিমাগারে শত শত কৃষকের আলু থাকায় কেজিপ্রতি এই বাড়তি অর্থ আদায়ে সামগ্রিকভাবে কৃষকের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ পড়ছে।
শহিদুল ও মুন্না নামে স্থানীয় দুই কৃষক বলেন, গত দুই বছর আলু চাষ করে তাঁদের লোকসান হয়েছে। এবারও আশানুরূপ দাম পাওয়া যায়নি। তাঁরা বলেন, ‘আমরা এমনিতেই ক্ষতির মধ্যে আছি। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে যদি আরও টাকা দিতে হয়, তাহলে কৃষকের ওপর চাপ আরও বাড়বে।’
আরেক কৃষক মোছাব্বির জানান, এক-দুই বস্তায় অতিরিক্ত দুই টাকা খুব বেশি মনে না হলেও শত শত বস্তায় তা বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, ‘আমার ১১৯ বস্তা আলু রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ বস্তা নিয়েছি, বাকি ৭৯ বস্তা নিতে এসেছি। কেজিপ্রতি অতিরিক্ত দুই টাকা চাওয়া হচ্ছে।’
তবে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উত্তরা কোল্ড স্টোরেজের নির্বাহী পরিচালক ফারহানা কণা। তিনি বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়নি। প্রতিটি কৃষক হিমাগারে ৬০ কেজির ওপর আলু রেখেছেন। সে হিসাবে সরকার নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।’
আলু নিতে আসা কৃষকদের হয়রানি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফারহানা কণা বলেন, ‘তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে।’
এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান ছনি বলেন, কৃষি বিপণন আইনে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দেয়। নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে। সত্যতা পাওয়ায় হিমাগার কর্তৃপক্ষকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমনটি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, শুধু জরিমানা করে বিষয়টি শেষ করলে তাঁদের ক্ষতি পূরণ হবে না। যাঁদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে টাকা নেওয়া হয়েছে, তাঁদের হিসাব করে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
সময়ের আলো/এনএন