বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির আগ্রহ বাড়াতে আগামী সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে রোডশো করতে যাচ্ছে সরকার। ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দুই দিনের এই আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেট্রোবাংলা। সিঙ্গাপুরের পর যুক্তরাষ্ট্রের হাউস্টনেও একই ধরনের একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর সময় এখনো নির্ধারণ হয়নি।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সম্প্রতি লন্ডনে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড এনার্জিস সামিটেও অংশ নেয় বাংলাদেশের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বরের ওই সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, অনুসন্ধান কার্যক্রম এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমোবিল, যুক্তরাজ্যের শেল ও ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি), ইতালির এনি এবং ব্রাজিলের পেট্রোব্রাসের মতো আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা হয়। তাদের সামনে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা, সিসমিক তথ্যের প্রাপ্যতা এবং সংশোধিত মডেল পিএসসি-২০২৬-এর সুবিধাগুলো তুলে ধরা হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাভিত্তিক কয়েকটি জ্বালানি কোম্পানিও বাংলাদেশের চলমান দরপত্র সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছে বলে জানা গেছে।
পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (কন্ট্রাক্ট) হাসান মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সেখানে দুই দিনের রোডশো আয়োজন করা হয়েছে। এতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেবেন।’
২৬ ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র
বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে ১১টি অগভীর সমুদ্রের এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রের ব্লক। দরপত্রে প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর।
আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশ্বের দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আলাদাভাবে যোগাযোগ করছে সরকার। তবে এখনো কোনো বিদেশি কোম্পানি দরপত্রে প্রস্তাব জমা দেয়নি।
এখন পর্যন্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্যাকেজ সংগ্রহ করেছে। আর দরপত্রের নথি কিনেছে তুরস্ক ও চীনভিত্তিক তিনটি কোম্পানি। এগুলো হলো তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত টার্কিশ পেট্রোলিয়াম ওভারসিজ কোম্পানি (টিপিএও), চীনের চায়না ন্যাশনাল অফশোর অয়েল করপোরেশন (সিএনওওসি) ইন্টারন্যাশনাল এবং সিনোপেক ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
এর মধ্যে টিপিএও গত ২৩ জুলাই, সিএনওওসি ১৭ আগস্ট এবং সিনোপেক ২৩ সেপ্টেম্বর দরপত্রের নথি সংগ্রহ করেছে।
অন্যদিকে তথ্য প্যাকেজ সংগ্রহ করেছে বেয়ারিঙ্গিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ, ক্রিসএনার্জি, পিইএএল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন, অনোডা ইনকরপোরেটেড, রাইস্টাড এনার্জি, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার, টিপিএও, সিএনওওসি ইন্টারন্যাশনাল, ইমপ্রেশন ভেঞ্চারস এজি এবং সিনোপেক ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট।
তথ্য প্যাকেজের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্লকের ভূতাত্ত্বিক ও ভূকম্পন জরিপের ফলাফল পর্যালোচনার সুযোগ পাচ্ছে কোম্পানিগুলো। এতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পেট্রোবাংলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘তথ্য প্যাকেজ কেনা মানেই দরপত্রে অংশ নেওয়া নয়। দরপত্রের নথি কেনা ও তা জমা দেওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।’
নতুন পিএসসিতে যেসব সুবিধা
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সংশোধিত মডেল পিএসসি-২০২৬-এ বেশ কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাইপলাইন বসানোর পর গ্যাস ক্রেতাদের সম্মতির ভিত্তিতে ‘পাইপলাইন ট্যারিফ’ বা মাসুল পাবে।
কূপ খননের ঝুঁকির ক্ষেত্রেও সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। কোনো কোম্পানি প্রথম অনুসন্ধান কূপ খনন করে গ্যাস না পেলেও দ্বিতীয় কূপ খননের ঝুঁকি নিলে ঠিকাদারের মুনাফার অংশ ১ শতাংশ বাড়বে। প্রথম দুটি কূপ ব্যর্থ হওয়ার পর তৃতীয় বা তার বেশি কূপ খনন করলে মুনাফার অংশ বাড়বে ২ শতাংশ।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের সময়সীমা ছয় বছর রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও তিন বছর বাড়িয়ে মোট নয় বছর পর্যন্ত অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট শর্তে অনুসন্ধান ও উন্নয়ন ব্যয়ের শতভাগ পুনরুদ্ধারের সুযোগও রাখা হয়েছে।
আগের মতো এবারও অংশগ্রহণকারীদের কোনো ‘সিগনেচার বোনাস’ বা ‘রয়্যালটি’ দিতে হবে না। বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কস্ট রিকভারির সুযোগ রাখা হয়েছে। ঠিকাদারের করপোরেট আয়করের দায় পেট্রোবাংলা বহন করবে। যন্ত্রাংশ আমদানিতেও শুল্ক দিতে হবে না।
পিএসসি অনুযায়ী, ঠিকাদারের উত্তোলিত গ্যাস প্রথমে কেনার অধিকার থাকবে পেট্রোবাংলার। সংস্থাটি গ্যাস না কিনলে ঠিকাদার দেশের ভেতরে তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে তা বিক্রি করতে পারবে। দেশের ভেতরে চাহিদা না থাকলে পেট্রোবাংলার সম্মতি নিয়ে গ্যাস রপ্তানির সুযোগও থাকবে।
অগভীর সমুদ্রের ব্লকে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাপেক্সের ১০ শতাংশ ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ থাকবে। অর্থাৎ বাপেক্স কোনো অর্থ বিনিয়োগ না করেই ১০ শতাংশ অংশীদার হবে এবং এর খরচ বহন করবে বিদেশি কোম্পানি। তবে গভীর সমুদ্রের ব্লকে বাপেক্সের কোনো অংশীদারত্ব থাকবে না।
এ ছাড়া শ্রমিকদের মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলে (ডব্লিউপিপিএফ) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক অবদানের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ করা হয়েছে। অনুসন্ধান ও উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফার পুরো অর্থ নিজ দেশে ফেরত নিতে পারবে।
আগের দরপত্রে সাড়া মেলেনি
বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে একসময় সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদন হতো। মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় সেই উৎপাদন বন্ধ হয়। এরপর দীর্ঘ সময়েও সমুদ্রে নতুন কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি।
২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র বাণিজ্যিক উৎপাদনে আনতে পারেনি বাংলাদেশ। অন্যদিকে ভারত ও মিয়ানমার সাগরে গ্যাস আবিষ্কারের পর তা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করছে।
২০২৪ সালের মার্চে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। পরে আগস্টে পটপরিবর্তনের পর দরপত্র জমার সময় আরও তিন মাস বাড়ানো হয়। সাতটি বিদেশি কোম্পানি দরপত্রের নথি সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয়নি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) সাইফুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘বিনিয়োগকারী ও বড় কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেকে আগ্রহী। তারা যোগাযোগ করছে এবং আমরা তথ্য দিচ্ছি। শর্তও শিথিল করা হয়েছে। এবার আমরা আশাবাদী যে কোম্পানিগুলো আগ্রহী হয়ে অংশ নেবে।’
আমদানিনির্ভরতা কমানোর তাগিদ
দেশে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন কমে আসছে। ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ম. তামিম বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান প্রয়োজন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা থাকায় বিদেশি কোম্পানিগুলো নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগে অনাগ্রহী। পেট্রোবাংলা মডেল পিএসসিতে শর্তগুলো যথেষ্ট আকর্ষণীয় করেছে। তবে সরকারের উচিত তেল ও গ্যাস খাতকে ডব্লিউপিপিএফে বাধ্যতামূলক অবদান রাখার বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়া। এতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
সময়ের আলো/এসএকে