দেশে বাণিজ্যিকভাবে ফাইভ-জি সেবা চালুর এক বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি পঞ্চম প্রজন্মের এই নেটওয়ার্ক। প্রয়োজনীয় তরঙ্গের স্বল্পতা, ফাইভ-জি সমর্থিত ডিভাইসের সীমিত প্রাপ্যতা, অবকাঠামোগত ঘাটতি, সরকার ও বিটিআরসির মধ্যে নীতিগত ও বাস্তবায়নগত সমন্বয়ের অভাব এবং অপারেটরদের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকাকে এ খাতের পাঁচ বড় জটিলতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, প্রয়োজনীয় তরঙ্গের স্বল্পতা, সীমিত ডিভাইস, অবকাঠামো ঘাটতি এবং সরকার ও বিটিআরসির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে ৫জি বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। এর সঙ্গে অপারেটরদের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকাও বড় বাধা।
তিনি বলেন, ৫জি শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়; শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। তাই সমন্বিত নীতি, পর্যাপ্ত তরঙ্গ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অপারেটরদের বিনিয়োগ নিশ্চিত করে গ্রাহকবান্ধবভাবে ৫জি বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে, কবে নাগাদ দেশে পূর্ণাঙ্গ ৫জি চালু হবে।
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ব যখন আরও উন্নত প্রজন্মের প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এখনও দুর্বল ৪জি নেটওয়ার্ক নিয়েই লড়ছে। এ অবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কার্যকর ব্যবহারও কঠিন হবে। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে কি না।
২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর দেশে বাণিজ্যিকভাবে ফাইভ-জি সেবা চালু করে গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটা। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে রবির প্রধান কার্যালয়ে যৌথভাবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। গ্রামীণফোন প্রথম পর্যায়ে সব বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সেবা চালু করে। রবি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাণিজ্যিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ হটস্পটে সেবা দেয়। বাংলালিংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক এখনও পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ৫জি চালু করেনি। বাংলালিংক বর্তমানে ৪জি সেবার মানোন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৪৪০টির বেশি স্থানে সীমিত পরিসরে ৫জি চালু রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও রেস্তোরাঁসহ প্রায় ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। ঢাকার বাইরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, খুলনা ও সিলেট বিভাগের ৪০০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও সীমিত পরিসরে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, পূর্ণাঙ্গ ৫জি সেবা চালুর জন্য কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও উৎপাদন খাতের প্রস্তুতি জরুরি। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোন কোন খাতে ৫জি সবচেয়ে বেশি কাজে লাগবে, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, স্পেকট্রাম পরিকল্পনা, ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ বৃদ্ধির কাজ চলছে।
মন্ত্রী বলেন, শুধু নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করলেই হবে না; ৫জির সুফল পেতে সংশ্লিষ্ট শিল্প ও সেবা খাতকেও প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
বর্তমানে দেশের মোট মোবাইল ব্যবহারকারীর মাত্র ৬ থেকে ১০ শতাংশের হাতে ৫জি সমর্থিত হ্যান্ডসেট রয়েছে। ফলে এ সেবার গ্রাহক প্রবৃদ্ধিও ধীর। দেশজুড়ে ৫জি সাইট স্থাপনের পাশাপাশি ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা এখন চলছে।
রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম সময়ের আলোকে বলেন, শিল্প ও এন্টারপ্রাইজ খাতে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবহারের জন্য ৫জি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশে এ খাতের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই যেসব এলাকায় ৫জি-সক্ষম ডিভাইসের ব্যবহার বেশি, সেখানে পর্যায়ক্রমে সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সব অপারেটর মিলিয়ে ৫জি হ্যান্ডসেটের হার ১০ শতাংশের কম। রবির গ্রাহকদের প্রায় ৬০ শতাংশের হাতে ৪জি মুঠোফোন থাকলেও ৫জি হ্যান্ডসেট রয়েছে ৬ থেকে ৭ শতাংশের কাছে। কিছু এলাকায় এ হার ২০ শতাংশ। যেসব এলাকায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ গ্রাহকের হাতে ৫জি মুঠোফোন থাকবে, সেসব এলাকায় সেবা চালু করা হবে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫জি সাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫জি শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেটের জন্য নয়; চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডাটা, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও চালকবিহীন প্রযুক্তির বিকাশেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। হ্যান্ডসেট সহজলভ্য হলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর ব্যবহার বাড়বে।
বর্তমান ৫জি প্রযুক্তিতে তাত্ত্বিকভাবে ডাউনলোডের গতি সর্বোচ্চ ২০ জিবিপিএস পর্যন্ত হতে পারে, যা ৪জির তুলনায় অনেক বেশি। এর লেটেন্সি বা রেসপন্স টাইম এক মিলিসেকেন্ডের কম হওয়ায় রিয়েল-টাইম ডাটা আদান-প্রদান, অনলাইন গেমিংসহ বিভিন্ন কাজে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়। একই সঙ্গে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১০ লাখ ডিভাইস সংযুক্ত করার সক্ষমতা থাকায় শিল্প ও স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম, সাশ্রয়ী ৫জি ডিভাইস, অবকাঠামো এবং অপারেটরদের বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে