বিশ্বনাথ পাটেকর— সিনেমার জগতে যিনি ‘নানা পাটেকর’ নামে কোটি মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। তিনি এমন এক শিল্পী, যাকে কোনো নির্দিষ্ট অভিনয়ের ছকে বাঁধা সম্ভব নয়। সেই নানা পাটেকর আর নেই।
গতকাল ভোরে গোয়ার দোনা পাওলায় নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে মারা গেছেন বলিউডের এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর দিয়েও তাকে বাঁচাতে পারেননি। তার ছেলে মালহার পাটেকর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
তার মৃত্যুতে বলিউডসহ ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোবিজ তারকারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন। গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে প্রয়াত অভিনেতার পরিবার, বন্ধু ও অসংখ্য ভক্তের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।
১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নানা পাটেকর শিল্পকলার শিক্ষা নিয়েছিলেন মুম্বাইয়ের স্যার জে. জে. ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টে। অভিনয়ের শুরু মারাঠি থিয়েটার দিয়ে। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তার আত্মপ্রকাশ। ‘অঙ্কুশ’, ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি : দ্য মিউজিক্যাল’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘আব তক ছাপ্পান’ একেকটি ছবিতে একেক রূপে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি।
‘সালাম বোম্বে!’ তাকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পরিচিত করে। তার অভিনয়ে ছিল এক ধরনের তীব্রতা— চোখের ভাষা, কণ্ঠের দৃঢ়তা এবং সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি তাকে সমকালীন অভিনেতাদের ভিড় থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ তার শিল্পীজীবনের স্বীকৃতির সাক্ষ্য বহন করে। গুরুগম্ভীর চরিত্রের পাশাপাশি ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টির মতো হাস্যরসাত্মক চরিত্রেও তিনি দেখিয়েছেন তার অভিনয়ের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য।
নানা পাটেকরকে সবশেষ দেখা গিয়েছিল বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত রোমান্টিক অ্যাকশন থ্রিলার চলচ্চিত্র ও’ রোমিও-তে। এতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন শহিদ কাপুর ও তৃপ্তি ডিমরি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রে পাটেকর মুম্বাই ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান ইসমাইল খানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি প্লেব্যাক গায়ক হিসেবেও কণ্ঠ দিয়েছেন নানা পাটেকর। যশবন্ত (১৯৯৭), ওজুদ (১৯৯৮) এবং আঁচ (২০০৩) চলচ্চিত্রে তিনি গায়ক হিসেবেও অবদান রেখেছিলেন। নানা পাটেকর শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন অভিনয়ের একজন নিবেদিতপ্রাণ কারিগর।
প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ পথচলায় তিনি প্রমাণ করেছেন— তারকা হওয়ার চেয়ে বড় পরিচয় একজন সত্যিকারের শিল্পী হওয়া। আজ থেকে তিনি স্মৃতির অংশ। কিন্তু তার কণ্ঠের সেই দৃঢ়তা, চোখের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সংলাপের সেই আগুন এবং চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা থেকে যাবে— পর্দায়, দর্শকের মনে আর ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে