কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে চায় ভারত। এ লক্ষ্যে দেশটিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে আমাজন, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। তবে এআই প্রযুক্তির ভিত্তি হিসেবে গড়ে ওঠা ডেটা সেন্টার নিয়ে আপত্তি তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, এসব স্থাপনা আবাসিক এলাকার পরিবেশ, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। কোথাও কোথাও এ নিয়ে শুরু হয়েছে প্রতিবাদও।
ভারতের মুম্বাইয়ে প্রকৌশলী তুষার শেঠির ২১ তলা অ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে একসময় দেখা যেত সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ এলাকা। এখন সেখানে গাছ কেটে তৈরি করা হচ্ছে আমাজনের একটি ডেটা সেন্টার। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে এআই অবকাঠামো খাতে প্রযুক্তি জায়ান্টটির ২১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ এই প্রকল্প।
৪৬ বছর বয়সি তুষার বলেন, ‘এটা আগে জানলে আমি এই ফ্ল্যাট কিনতাম না।’ মাত্র পাঁচ মাস আগে ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া থেকে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ও আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের উপকণ্ঠ—বিভিন্ন জায়গায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের প্রতিবাদ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, এসব স্থাপনা থেকে শব্দদূষণ হয়, বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ে, পানির সংকট তীব্র হয় এবং আবাসিক এলাকা ক্রমে শিল্পাঞ্চলের রূপ নেয়।
ভারতেও সেই বিরোধিতা জোরালো হচ্ছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের মহারাষ্ট্র থেকে দক্ষিণের অন্ধ্র প্রদেশ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ডেটা সেন্টার নির্মাণে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে আমাজন, গুগল ও মাইক্রোসফট। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লক্ষ্য, ভারতকে এমন একটি কেন্দ্রে পরিণত করা, যেখানে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো এআইয়ের অত্যাধুনিক মডেল তৈরিতে এখনো সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি ভারত। তাই দেশটি এআইয়ের ভৌত অবকাঠামো—বিশেষ করে ডেটা সেন্টার—গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এই অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও বৈশ্বিক এআই অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করা সম্ভব। একসময় বৈশ্বিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা ও কাজের কেন্দ্র হিসেবে ভারতের যে পরিচিতি ছিল, তার গুরুত্ব কমে আসার প্রেক্ষাপটেও এই কৌশলকে সামনে আনা হচ্ছে।
তবে সরকারের এই উচ্চাভিলাষের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হচ্ছে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ডেটা সেন্টারের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের উদ্বেগের কারণে।
ভারতে বিশ্বের মোট মিঠাপানির মাত্র ৪ শতাংশ রয়েছে, অথচ দেশটিতে বাস করে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ। এরই মধ্যে পানিসংকটে থাকা বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠছে ডেটা সেন্টার। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক হিসাব অনুযায়ী, চলতি দশকে ভারতের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ডেটা সেন্টার উচ্চ পানিসংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্ডর ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের ডেটা সেন্টারগুলোতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি লিটার পানি ব্যবহৃত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি হতে পারে।
মুম্বাইয়ে আমাজনের প্রকল্প ঘিরে ক্ষোভ
মুম্বাইয়ের কাছে আমাজনের ডেটা সেন্টার প্রকল্পটি ভারতে এ নিয়ে বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রয়টার্সের দুই ডজনের বেশি বাসিন্দার সাক্ষাৎকার এবং সরকারি চিঠিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্পটি স্থানীয় বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে উদ্বেগ বাড়ছে। পাশাপাশি এর শব্দ শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
তবে আমাজন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, পানি ও বিদ্যুতের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকায় এটি জনসেবার অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে না। তা সত্ত্বেও প্রকল্পটি ঘিরে রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছে এবং বিরোধী দলের রাজনীতিকেরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
মোদি সরকারও ডেটা সেন্টারের পক্ষে জনমত গড়ার চেষ্টা করছে। অনলাইনে এসব স্থাপনাকে ভারতের ডিজিটাল জীবনের ‘অদৃশ্য চালিকাশক্তি’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারের যুক্তি, আধুনিক প্রযুক্তিতে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার আরও দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের ইলেকট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তারা কোনো জবাব দেয়নি।
গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রকল্প এলাকার পাশে কয়েক শ বাসিন্দা বিক্ষোভ করেন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘ডেটা সেন্টার হলো বিদ্যুতের রক্তচোষা।’ তারা প্রকল্পটি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।
প্রকল্পটির কাছাকাছি একটি ফ্ল্যাট কেনা ৬২ বছর বয়সি বাসিন্দা বাসুধা শেঠি বলেন, ‘ডেটা সেন্টারটি বন্ধ হলে আমরা এখানে থাকব। আর এটি চালু হলে আমরা চলে যাব।’ অবসরের জীবন শান্তিতে কাটাতে চান তিনি।
বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ আমাজনের
প্রকল্প এলাকার আশপাশে বসবাসকারী এক হাজারের বেশি মানুষের অভিযোগ, স্থানীয়দের সঙ্গে অর্থবহ কোনো আলোচনা ছাড়াই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ডেটা সেন্টার রয়েছে। সেখানে ২০২৪ সালে তিনটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের একটি প্রস্তাব স্থগিত করেছিল আমাজন। আবাসিক এলাকার নৈকট্য ও শব্দদূষণ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য আরও সময় নিতে চেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। মুম্বাইয়ের বাসিন্দাদের দাবি, তাদের ক্ষেত্রে এমন সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আমাজনের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তির ভাষ্য, ভারত সরকারের কর্মকর্তারা বিক্ষোভ একসময় থেমে যাবে বলে ইঙ্গিত দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আপাতত খুব বেশি উদ্বিগ্ন নয়। তবে শব্দদূষণ, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বাসিন্দাদের উদ্বেগ মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা করছে তারা।
ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ডেটা সেন্টার নির্মাণের কিছু মূল্য দিতে হয়। আমাজন বিশ্বব্যাপী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে এবং অসুবিধা সীমিত রাখতে প্রস্তুত।’ তার ভাষায়, আপাতত বিক্ষোভের মধ্যেই প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে চলা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
আমাজন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, তাদের ডেটা সেন্টারে পানি ছাড়াই শীতলীকরণব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। আবাসিক এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে আলাদা উৎসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ নেওয়া হবে এবং শব্দ কমাতে ব্যবস্থা রাখা হবে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, যত গাছ কাটা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি নতুন চারা লাগানো হয়েছে।
তবে শিল্প খাতের কয়েকজন নির্বাহীরও মত, আবাসিক এলাকার পাশে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা উচিত নয়। ১৪টি ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সিফি ইনফিনিট স্পেসেসের প্রধান নির্বাহী শরদ আগরওয়াল সেপ্টেম্বরে এক শিল্পবিষয়ক অনুষ্ঠানে বলেন, তিনি কখনো আবাসিক এলাকায় ডেটা সেন্টার স্থাপন করবেন না।
তার মতে, এসব স্থাপনার জন্য বিপুল পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানির প্রয়োজন হয়। সংকটের সময় আবাসিক এলাকার পাশে থাকলে এসব সম্পদ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে ভারতে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে চার বছরে ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে মাইক্রোসফট। এই অর্থের বড় অংশই এআই অবকাঠামো খাতে ব্যয় করার কথা।
অন্য রাজ্যেও রাজনৈতিক বিরোধিতা
দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্র প্রদেশে গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টার প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন পরিবেশকর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বন্য প্রাণী, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অনুমতি ছাড়াই একটি মন্দিরের জমি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে গুগল ও রাজ্য সরকার কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ডেটা সেন্টার নিয়ে বিরোধ রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেপ্টেম্বরে মুম্বাইয়ে আমাজনের প্রকল্প সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভে যোগ দেন বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা আদিত্য ঠাকরে। তিনি বলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় ফিরলে প্রকল্পটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেবে।
মুম্বাইয়ে সম্পত্তি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত অতুল যাদবের মতে, ডেটা সেন্টারের কারণে আশপাশের এলাকার দৃশ্যপট ও সম্পত্তির মূল্য নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়ছে। এতে পুনর্বিক্রয়ের বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।
এলাকাটিতে ৩০ বছর ধরে বসবাস করা ৬৮ বছর বয়সি বিদ্যা কদম বলেন, ‘এটি বন্ধ করতে আমরা রাস্তায় নামব এবং যা যা করা দরকার, সবই করব।’
সময়ের আলো/জেডি