প্রতিদিন বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ফেলে দেওয়া হয় কাগজ, প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা ধরনের বর্জ্য। পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে এসব জিনিস অনেকে ডাস্টবিনে কিংবা রাস্তার পাশে ফেলে দেন। অথচ অন্যের চোখে মূল্যহীন সেই বর্জ্যই কারও কারও কাছে বেঁচে থাকার অবলম্বন। আবর্জনার স্তূপে কেউ খোঁজে জীবিকার উপকরণ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে তোলা একটি ছবি তুলে ধরেছে এমনই কঠিন বাস্তবতা। ছবিতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে ফেলে রাখা কাগজ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যের স্তূপে বসে প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজছেন ফিরোজ মিয়া। পরনে মলিন পোশাক, মাথায় সবুজ টুপি, চোখে চশমা। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পরিত্যক্ত জিনিসপত্রের মধ্যেই তাঁর জীবিকার সন্ধান। দৃশ্যটি কেবল একজন মানুষের জীবনসংগ্রামের ছবি নয়; নগরজীবনের আড়ালে থেকে যাওয়া প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।
১৫ বছর ধরে বর্জ্য সংগ্রহ
অভাবের তাড়নায় রংপুর নগরের মুন্সিপাড়া এলাকার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের একটি বস্তিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন ৪৫ বছর বয়সী ফিরোজ মিয়া। গত ১৫ বছর ধরে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
ফিরোজের মতো অনেক মানুষের দিন কাটে অন্যের ফেলে দেওয়া জিনিসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কিছু খুঁজে। কেউ সংগ্রহ করেন পুরোনো কাগজ ও বই, কেউ খোঁজেন প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী। পরে এসব জিনিস ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে যা পান, তা দিয়েই চলে সংসার।
তাঁদের কাছে বর্জ্যের স্তূপ নিছক ময়লা-আবর্জনা নয়, বরং উপার্জনের সম্ভাবনা। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, দুর্গন্ধ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করে তাঁরা আয় করেন সামান্য অর্থ। সেই অর্থে খাবার কেনা, ঘরভাড়া দেওয়া এবং পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন।
ফিরোজের জীবনসংগ্রাম দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। যথাযথ কর্মসংস্থানের সুযোগ ও সামাজিক সহায়তা পেলে তাঁর মতো মানুষও আরও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পেতে পারেন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও অবদান
অন্যের ফেলে দেওয়া জিনিস সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার মাধ্যমে এসব মানুষ নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও ভূমিকা রাখেন। তাঁদের সংগ্রহ করা কাগজ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য সামগ্রী পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। এতে একদিকে বর্জ্যের পরিমাণ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব হয়।
অথচ নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখলেও তাঁদের অনেকের জীবন কাটে অনিশ্চয়তায়। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসামগ্রী, স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে তাঁদের কাজ হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। মিশ্র বর্জ্যের মধ্যে থাকা ধারালো বস্তু, দূষিত সামগ্রী ও ক্ষতিকর পদার্থ থেকে দুর্ঘটনা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও থাকে।
উন্নয়নের সঙ্গে চাই মানবিকতা
নগরীর উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক প্রশস্ত করা, ভবন নির্মাণ কিংবা সৌন্দর্যবর্ধন নয়; উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। যাঁরা প্রতিদিন বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের কাজকে অবহেলা না করে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ জন্য বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সংগ্রহের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, সংগ্রহকারীদের নিরাপত্তাসামগ্রী সরবরাহ এবং তাঁদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলে নির্ধারিত স্থানে ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে নগরী পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহকারীদের কাজও নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব।
রংপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতাসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান মিজুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আমরা প্রতিদিন অপ্রয়োজনীয় মনে করে যেসব জিনিস ফেলে দিই, সেগুলোর কোনো কোনোটি অন্য একজন মানুষের এক বেলার খাবার জোগাড়ের উপায়। তাই বর্জ্য ফেলার আগে একবার ভাবা প্রয়োজন—আমাদের কাছে যা মূল্যহীন, অন্য কারও কাছে তা-ই হয়তো বেঁচে থাকার অবলম্বন।
রংপুর সিটি করপোরেশনের সামনে তোলা ফিরোজ মিয়ার ছবিটি সেই বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। একটি শহর কতটা উন্নত, তা শুধু তার রাস্তাঘাটের সৌন্দর্য কিংবা স্থাপনা দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই শহর তার প্রান্তিক মানুষকে কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার সুযোগ দিতে পারছে, তার মধ্যেও উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে।
সময়ের আলো/এনএন