ককরোচদের বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানী দিল্লি লকডাউন করে ফেলেছে মোদির পুলিশ বাহিনী। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি, সর্বভারতীয় ছাত্র সমিতিসহ অন্যান্য সংগঠন শনিবার বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয়। একে কেন্দ্র করে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে রাজধানী দিল্লি। বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ, ২৪৫টি ট্রেন বাতিল এবং মধ্য দিল্লিতে মুঠোফোনে ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করাসহ নজিরবিহীন নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। দিল্লিকে একরকম বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে।
দিল্লির একজন সিনিয়র সাংবাদিক জানান, স্মরণকালে ভারতে এমন অবস্থা দেখা যায়নি। রাজধানী দিল্লিজুড়ে যেন অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক বিভিন্ন নির্বাচনে পরাজিত হেভিওয়েট প্রার্থীরা কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হয়ে আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ায় মোদি সরকারের জন্য পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। এসবের মধ্যে মোদির রক্ষীবাহিনী হিসেবে পরিচিতি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংস্থা (আরএসএস) যদি বিজেপির পাশে না দাঁড়ায় বা আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয় তবে অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
দিল্লির পূর্বনির্ধারিত এ বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে পুলিশ। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে বিমানবন্দর থেকেই আটকের পর দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এআইএসএ-র নেত্রী নেহা বোরাসহ আরও কয়েকজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া সকালে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও তার বাসভবন থেকে আটক করে পুলিশ। এখনও ধরপাকড় চলছে সমানতালে।
এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ অন্যান্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রমতে, দিল্লির লোধি এস্টেটে নিজের বাসার সামনে থেকেই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালকে আটক করে পুলিশ। এর আগে আটক হন ত্রিপুরা রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। যন্তরমন্তরের দিকে যাওয়া অন্তত ২০০ বিক্ষোভকারীকে পুলিশ আটকে দেওয়ার পর আন্দোলনকারীরা সবাইকে দিল্লি হাটের দিকে মার্চ করার আহ্বান জানান। এর মাঝেই তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) এমপি সাকেত গোখলে জানান যে, দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বেশ কয়েকজন টিএমসি নেতাকে দিল্লির বাসভবনের বাইরে থেকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
এর আগে শনিবার সকালে যন্তরমন্তরে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে বিমান থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা— অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে বিমান থেকেই আটক করে দিল্লি পুলিশ। তবে তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি। পরে সিজেপির পক্ষ থেকে এক ভিডিও বার্তায় জানানো হয় যে অজিঙ্ক শিন্ডে যন্তরমন্তরের বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেবেন।
ইউটিউবে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ফলোয়ার থাকা জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর নিজ বাসা থেকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। সিজেপির বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা ধ্রুব রাঠিকে এই সমাবেশের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। এ ছাড়া দিল্লির বিভিন্ন স্থান থেকে কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ সিপিআই(এম)-এর বেশ কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে। এমনকি পাঞ্জাবের চণ্ডীগড় থেকেও আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা মনীশ সিসোদিয়াসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে অভিনেতা ইমরান খানকেও।
এক বিবৃতিতে সিজেপি বলেছে, বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই নেতৃত্বকে অকার্যকর করে দিতে দিল্লি পুলিশ পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাদের আটক করেছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ভণ্ডুল করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ দলটির। বিবৃতিতে সিজেপি আরও বলেছে, এ ঘটনা চলাচলের স্বাধীনতার স্পষ্ট লঙ্ঘন। দলটি অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে।
এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই রাজধানীজুড়ে অন্তত ৩০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে বহুস্তরীয় নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে শনিবারের এই সমাবেশ নিষিদ্ধ করার কথা জানান। একই সঙ্গে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
ভোটার তালিকা সংশোধনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এর আগে গত ২ অক্টোবর মুম্বাইতে বিক্ষোভ করেছিল সিজেপি। সেই ধারাবাহিকতায় দিল্লিতে এই নতুন আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। তবে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভ আয়োজনের প্রয়োজনীয় অনুমতি আয়োজকদের ছিল না এবং জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে তাদের আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর নির্বাচন কমিশনে জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, গত ১০ মাসে এসআইআর কার্যক্রম-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতির বিষয়ে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অভিযোগ করেন, ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন এনডিএ এবং বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মধ্যকার প্রাপ্ত ভোটের সামান্য ব্যবধানের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ভোটার তালিকায় এমন বড় ধরনের পরিবর্তন নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। তাদের দাবি, ভোটার তালিকার এসআইআরের সব বড় সিদ্ধান্ত পুরো কমিশনের সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছিল। কর্মসূচিকে সামনে রেখে যন্তরমন্তর এবং সেখানে যাওয়ার সব রাস্তায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এমনকি যন্তরমন্তরে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। রাজধানীর তিনটি প্রধান প্রবেশ ও প্রস্থান পয়েন্টে লাউডস্পিকারে হিন্দি ও ইংরেজিতে ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারার অধীনে সমাবেশ, মিছিল ও সড়ক অবরোধের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, শনিবারের সম্ভাব্য জমায়েত নিয়ন্ত্রণে তাদের নিজস্ব ১৫ হাজারের বেশি সদস্য এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রায় ২৬ হাজার সদস্য মোতায়েন রয়েছে। নজিরবিহীন এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে দিল্লির সার্বিক গণপরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) শুক্রবার রাত ৯টা থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান ফটক বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
এ ছাড়া ন্যামো ভারত ট্রেনের সরাই কালে খাঁ ও নিউ অশোক নগর স্টেশন দুটিও ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সড়কে তীব্র যানজটের আশঙ্কায় শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছানোর নির্ধারিত সব মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন তাদের শুরুর স্টেশন থেকেই বাতিল করেছে ভারতীয় রেলওয়ে। পাশাপাশি আবগারি দফতরের নির্দেশনায় ৯ ও ১০ অক্টোবর পুরো দিল্লিতে খুচরা মদের দোকানগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।
এদিকে ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দিল্লিতে গ্রেফতার হওয়ার দিনটিতেই তার দাদির মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালে মহারাষ্ট্র রাজ্যের হিঙ্গোলি জেলার সান্তুক পিম্পরি গ্রামে বয়সজনিত রোগে ভুগে দীপকের দাদির মৃত্যু হয়। এনডিটিভি জানিয়েছে, ওই সময় তার নাতি দীপকে সিজেপির অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে মুম্বাই থেকে দিল্লিগামী একটি ফ্লাইটে উঠে গিয়েছিলেন। তাদের দিল্লির যন্তরমন্তরে সিজেপির এক প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু দিল্লিতে নামার আগেই উড়োজাহাজ থেকে দীপকে ও সিজেপির আরও দুই নেতাকে আটক করে পুলিশ।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, তারা দীপকেকে (৩১) তার দাদির মৃত্যুর কথা অবহিত করে তার শেষকৃত্যে যেন তিনি যোগ দিতে পারেন, সে জন্য তাকে মহারাষ্ট্রে উড়িয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ‘যথাযথ সংবেদনশীলতার’ সঙ্গে অবিলম্বে দীপকেকে তার দাদির মৃত্যুর কথা জানিয়েছে আর তাকে শেষকৃত্যের নির্ধারিত সময়ের কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ এখন বলছে, মানবিক কারণে তারা দীপকেকে তার গ্রামে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে চায়। এখন দীপকে সিদ্ধান্ত নেবেন, তিনি দাদির শেষকৃত্যে যোগ দিতে যাবেন না দিল্লিতে আটক থেকেই আন্দোলন চালিয়ে নেবেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও