চকলেট পছন্দ করেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে এই জনপ্রিয় খাবার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। এমনকি আগামী কয়েক দশকে কোকো উৎপাদন মারাত্মক সংকটে পড়লে চকলেট হারিয়েও যেতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা অক্সফামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে কোকো চাষ হুমকির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমানে কোকো উৎপাদনের উপযোগী এলাকাগুলোকে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে সরিয়ে নিতে হতে পারে। তবে, এসব এলাকার বড় একটি অংশ বন্য প্রাণীদের অভয়ারণ্য হিসেবে সংরক্ষিত।
কোকোগাছের জন্য আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ু এবং প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপযোগী। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা বাড়ছে, যা কোকো চাষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ট্রপিক্যাল অ্যাগ্রিকালচারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট কোকো উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে ঘানা ও আইভরি কোস্ট থেকে। দেশ দুটিতে ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। ফলে, পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব ও অতিরিক্ত গরমে কোকো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চকলেট পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আগেই এর দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০৩০ সালের কাছাকাছি সময়ে চকলেট অত্যন্ত দামি বিলাসপণ্যে পরিণত হতে পারে।
একটি কোকোগাছ পূর্ণতা পেতে প্রায় পাঁচ বছর সময় নেয় এবং এর জীবনকাল প্রায় ৩০ বছর। ফলে, বর্তমানে থাকা গাছগুলোর ওপর সংকটের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে নাও পড়তে পারে। তবে, ভবিষ্যতে নতুন করে কোকো চাষের ক্ষেত্রে কৃষকদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে কোকো উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে গবেষক ও চকলেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান চকলেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মার্স ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে কোকোগাছের ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করছে। ক্রিস্পার প্রযুক্তিতে জিন সম্পাদনার মাধ্যমে খরা ও উষ্ণ আবহাওয়া সহ্য করতে সক্ষম কোকোগাছ তৈরির চেষ্টা চলছে।
পাশাপাশি, কৃষকদের রোগপ্রতিরোধী কোকোগাছ চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী টেকসই পদ্ধতি ‘ক্যাব্রুকা’ ব্যবহার করে জঙ্গলের গাছের ছায়ায় কোকো চাষের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান চকলেটে কোকোর পরিমাণ কমিয়ে বিকল্প উপাদান ব্যবহারের দিকেও ঝুঁকছে।
এ ক্ষেত্রে সাদা চকলেটের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এতে কোকোর কঠিন অংশ থাকে না; বরং কোকো বাটার, দুধ ও চিনি ব্যবহার করা হয়। ফলে, কোকো সংকটের প্রভাব এর ওপর তুলনামূলক কম হতে পারে।
ইউসি বার্কলের বিজ্ঞান যোগাযোগ ব্যবস্থাপক মেগান হচস্ট্রাসারের মতে, চকলেট হয়ত হঠাৎ করেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। তবে, কোকো উৎপাদনের বর্তমান পরিস্থিতি বেশ কঠিন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা না গেলে ভবিষ্যতে চকলেট উৎপাদন ও এর দাম- দুই ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
সূত্র : ডেইলি মেইল, মিডয়াম, দ্য ডেইলি ডাইজেস্ট
সময়ের আলো/মহু