হামকে অনেকেই শিশুদের একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ হিসেবে দেখেন। জ্বর, সর্দি, কাশি ও শরীরে লালচে দানা উঠলেই কয়েক দিন পর ভালো হয়ে যাবে, এমন ধারণাও আছে। হামকে এতটা সহজভাবে না দেখাই ভালো।
হামের প্রাথমিক উপসর্গ অনেক সময় সাধারণ ভাইরাল জ্বরের সঙ্গে মিলে যায়। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীর খারাপ দিয়ে শুরু হতে পারে। পরে মুখ থেকে শুরু করে শরীরে লালচে দানা দেখা দেয়। তাই শুরুতেই হাম শনাক্ত করা সবসময় সহজ হয় না। তবে শিশুর জ্বরের সঙ্গে তীব্র কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ছড়িয়ে পড়া র্যাশ দেখা দিলে হাম সন্দেহ করতে হবে।
রোগ নির্ণয়ে দেরি হলে শুধু চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয় না, পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক। তাই আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হামের নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা সাধারণত নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো অবস্থায় রাখা এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা। পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার, বয়স অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতে হবে।
হামে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি থাকলে রোগের তীব্রতা ও জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিজের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত ভিটামিন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট দেওয়া ঠিক নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অ্যান্টিবায়োটিক। হাম ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় সাধারণভাবে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে হাম সারানো যায় না। তবে নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ বা অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। তাই শিশুর জ্বর বা কাশি হলেই নিজের মতো অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।
হামের কারণে শিশুর শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। রোগীর খাওয়ায় অরুচি, ডায়রিয়া বা বমির কারণে শরীরে পানি ও পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকে। একই সঙ্গে হামের সংক্রমণ রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে থাকে। ফলে সেরে ওঠার পরও শিশু সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে, ক্ষুধা কম থাকতে পারে কিংবা কাশি কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।
এ সময় শিশুকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবারে ফিরিয়ে আনতে হবে। খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, দুধ বা বয়স উপযোগী অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখতে হবে। শিশুর ঘুম ও বিশ্রামও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু ওজন স্বাভাবিক হচ্ছে কি না তা নয়, শিশুর স্বাভাবিক খেলাধুলা, ক্ষুধা ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতাও লক্ষ করতে হবে।
হামের সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের প্রদাহও রয়েছে। তাই হাম সেরে যাওয়ার পরও যদি কাশি বা শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে, শিশু খেতে পারে না, প্রস্রাব কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেয়, খিঁচুনি হয়, খুব দুর্বল হয়ে পড়ে বা জ্বর আবার ফিরে আসে, তা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু, খুব ছোট বয়সের শিশু, ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি থাকা শিশু এবং যাদের আগে থেকেই কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি নজরদারি প্রয়োজন।
হাম থেকে সুস্থ হওয়া মানেই ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। কারণ এই রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে নিরাপদ।
লেখক : সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন হাসপাতাল
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে