যুদ্ধবিরতির এক বছর পরও গাজা উপত্যকার ৬৫ শতাংশ এলাকায় ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ সীমিত করে রেখেছে ইসরায়েল। ফলে উপত্যকার বাকি ৩৫ শতাংশ এলাকায় গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে প্রায় ২১ লাখ মানুষকে। আল-জাজিরার মানচিত্রভিত্তিক এক বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে গাজায় নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা আরও বাড়িয়েছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েলি সেনাদের ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত পিছু হটার কথা ছিল। পরে ধাপে ধাপে আরও সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও উল্টো নতুন এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে তারা।
রোববার গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শুজাইয়া এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা হলুদ রঙের কংক্রিটের চিহ্নিত ব্লকগুলো কয়েক ডজন মিটার পশ্চিমে সরিয়ে নেয়। এতে ওই এলাকার আরও বেশি অংশ ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়।
গাজা সিটি থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক ইব্রাহিম আল-খলিলি বলেন, ‘ইয়েলো লাইন এখন কোথায়, শুধু সেটিই বিষয় নয়; পরবর্তী সময়ে এটি কোথায় সরানো হতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।’ গত তিন বছরে বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারগুলোকে কোথায় আশ্রয় নেবে, সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
যুদ্ধের আগে ও এখন গাজার চিত্র
যুদ্ধের আগে ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের গাজা উপত্যকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে প্রায় ৬ হাজার মানুষ বসবাস করতেন। যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েলি সেনাদের পিছু হটার পরও উপত্যকার ৫৩ শতাংশ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফিলিস্তিনিদের জন্য অবশিষ্ট ছিল ৪৭ শতাংশ এলাকা।
বর্তমানে গাজার ৬৫ শতাংশ এলাকায় প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় ২১ লাখ মানুষকে প্রায় ১২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বসবাস করতে হচ্ছে। এতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ হাজারে। প্রতিজনের ভাগে পড়ছে গড়ে মাত্র ৬১ বর্গমিটার জায়গা—যার মধ্যেই আশ্রয়, সড়ক, স্কুল, হাসপাতাল ও কৃষিজমি রয়েছে।
জাতিসংঘের স্যাটেলাইট কেন্দ্র ইউএনওস্যাটের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৮২ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, উপত্যকার মাত্র ৩ শতাংশ কৃষিজমি অক্ষত এবং ব্যবহারযোগ্য রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দফতর (ওসিএইচএ) বলছে, গাজার অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ এলাকা আগে থেকেই অতিরিক্ত জনাকীর্ণ। সহায়তা সংস্থাগুলো বর্ষা মৌসুমের আগে পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে চাইলেও প্রবেশে বিধিনিষেধ বড় বাধা হয়ে আছে। জাতিসংঘের হিসাবে, বন্যার ঝুঁকিতে থাকা বাস্তুচ্যুতদের শিবিরগুলোতে ৯ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করছেন। তাঁদের অধিকাংশই তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে রয়েছেন।
‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে যাওয়াও প্রাণঘাতী হতে পারে। ইসরায়েল ওই রেখার ওপারের এলাকাকে কার্যত অবাধে গুলি চালানোর অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। সেখানে কাছে যাওয়া ফিলিস্তিনিরা গুলির শিকার হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজাজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। এরপর উপত্যকার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের অবরোধ, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও নতুন করে বিস্তৃত হওয়া প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞায় গাজার মানুষের বসবাসের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি