নড়াইলের বিভিন্ন বিলে ও নিম্নাঞ্চলে ছাড়পত্র ছাড়াই অপরিকল্পিতভাবে মৎস্যঘের খননের মহোৎসব চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমতি ও সরকারি বিধানের তোয়াক্কা না করে নির্মিত এসব ঘেরের কারণে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ও পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নড়াইল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ তিন ফসলি কৃষি জমি এক বা দুই ফসলি জমিতে রূপ নিচ্ছে এবং হাজার হাজার একর জমি সারা বছর জলাবদ্ধ হয়ে অনাবাদি থাকছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য।
কৃষক ও স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বিলের ভেতরের উন্মুক্ত স্থানে মাটি কেটে উঁচু বাঁধ নির্মাণ ও গভীর ঘের তৈরি করায় বর্ষাকালে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে কুমড়ির বিল, চাচড়ীর বিল, পাটেরশরী বিল ও ইচ্ছামতির বিলসহ অন্তত ১৮-২০টি বিলের হাজার হাজার একর জমিতে ৪ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত পানি জমে থাকছে।
লোহাগড়া উপজেলার সুরুশুনা গ্রামের কৃষক তুহিন শেখ জানান, ইচ্ছামতি বিলে আগে বছরে একাধিক ফসল হত, কিন্তু এখন দীর্ঘদিন পানি আটকে থাকায় একটির বেশি ফসল চাষ করা যাচ্ছে না।
কুমড়ি বিলের কৃষক কামরুল ইসলাম ও চাচড়ী বিলের কৃষক আলমগীর বলেন, বিলে ঘেরের দাপটে এখন আর আবাদের পরিবেশ নেই; অনেক জমি বছরের পর বছর পুরোপুরি অনাবাদি থাকছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৫৭টি বিলের মধ্যে অন্তত ২০টি বিলে অপরিকল্পিত ঘের খননের ফলে প্রায় ১০-১২ হাজার হেক্টর তিন ফসলি জমি এক বা দুই ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া আরও অন্তত ২ হাজার হেক্টর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার। তবে জেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ তিন শত একর।
পরিবেশ অধিদপ্তর নড়াইলের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল মালেক মিয়া জানান, আইন অনুযায়ী ৫ একরের নিচে ঘের খননে পরিবেশের ছাড়পত্র এবং ৫ একরের ওপরে হলে অবস্থানগত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে সরকারি ফি জমা দিয়ে এসব অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু জেলার একটি ঘেরও এই নিয়ম মানেনি। জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্যমতে, নড়াইলের তিনটি উপজেলায় ৫৭টি বিলে মোট ৫ হাজার ৩৯১টি মৎস্যঘের রয়েছে। এসব ঘের থেকে আইন মেনে ফি আদায় করা গেলে সরকারের বছরে অন্তত ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হত।
অপরিকল্পিত ঘেরের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাস নষ্ট হওয়ায় সংকটে পড়েছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য। উন্মুক্ত জলাভূমি সংকুচিত হওয়ায় দেশীয় মাছ, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বিচরণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান সৈয়দ মোর্শেদ হাসান বলেন, পরিযায়ী ও দেশীয় পাখির অন্যতম আশ্রয়স্থল হলো উন্মুক্ত বিল। জলাশয়গুলো ব্যক্তিগত ঘেরে রূপ নেওয়ায় নিরাপদ খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে পাখির আগমন ও জলজ প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
এছাড়া ঘেরে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে আশপাশের খাল-বিলের পানি দূষিত হচ্ছে বলে জানান পরিবেশকর্মী যাযাবর মনির। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইলের সভাপতি শাহ আলম বলেন, উন্মুক্ত জলাশয় কেবল মাছ চাষের জায়গা নয়; এগুলো ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য ও পানি নিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণ করে। ঘেরের কারণে এগুলো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার হারাচ্ছেন।
এনজিও ‘স্বাবলম্বী’র নির্বাহী পরিচালক কাজী হাফিজুর রহমান দ্রুত তদন্ত করে অবৈধ ঘেরের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার দাবি জানান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইলের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, কৃষি জমিতে ঘের করতে হলে শ্রেণি পরিবর্তন ও পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান জানান, ফসলি জমিতে ঘের না করার জন্য চাষীদের নিয়মিত নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/এনএন