ঢাকার ঘুম ভাঙার আগেই যে মানুষগুলোর দিন শুরু হয়ে যায়

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

রাতের অন্ধকার তখনো পুরোপুরি কাটেনি। শহরের অলিগলি ও প্রধান সড়কগুলো ঘুমের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ মানুষ তখনো বিছানায়। কেউ গভীর

2026-10-14T08:42:30+00:00
2026-10-14T08:47:20+00:00
 
  বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬,
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
ঢাকার ঘুম ভাঙার আগেই যে মানুষগুলোর দিন শুরু হয়ে যায়
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৪২ এএম  আপডেট: ১৪.১০.২০২৬ ৮:৪৭ এএম
রিক্সাচালক, হকার, বাসচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নির্মাণশ্রমিকদের সকাল শুরু হয় ভোর হওয়ার আগেই। ছবি : এআই
রাতের অন্ধকার তখনো পুরোপুরি কাটেনি। শহরের অলিগলি ও প্রধান সড়কগুলো ঘুমের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ মানুষ তখনো বিছানায়। কেউ গভীর ঘুমে, কেউ হয়ত নতুন দিনের প্রস্তুতির কথা ভাবছে। কিন্তু এই শহরের কিছু মানুষের সকাল অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে তারা ঘর ছেড়েছেন, কাঁধে তুলে নিয়েছেন দায়িত্ব, হাতে নিয়েছেন কাজের সরঞ্জাম। তাদের ঘাম ও শ্রমেই ধীরে ধীরে জেগে ওঠে ঢাকা।

ভোরের ঢাকার দিকে তাকালে দেখা যায় এক ভিন্ন শহর। যে শহরের ব্যস্ততা শুরু হয় মানুষের চোখ খোলার আগেই। এই শহরকে সচল রাখতে প্রতিদিন সবার আগে রাস্তায় নামেন রিকশাচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, সংবাদপত্র বিক্রেতা ও বাসচালকের মতো অসংখ্য মানুষ। তাদের অনেকের নাম আমরা জানি না, তাদের মুখও হয়ত মনে থাকে না। অথচ প্রতিদিনের নাগরিক জীবনের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা তাদের শ্রম।

ভোরের রাস্তায় রিকশার চাকা

পূর্ব আকাশে আলো ফোটার আগেই রিকশার প্যাডেলে পা রাখেন অনেক চালক। কেউ রাত কাটিয়েছেন নিজের ছোট্ট ঘরে, কেউ আবার রিকশার পাশেই কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়েছেন। দিনের প্রথম যাত্রী পাওয়ার আশায় তারা দাড়িয়ে থাকেন হাসপাতালের সামনে, বাজারের মোড়ে কিংবা বাসস্ট্যান্ডের পাশে।

তাদের কাছে সকাল মানে শুধু নতুন দিনের শুরু নয়, বরং আয়ের নতুন সম্ভাবনা। পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, ঘরভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের হিসাব নিয়ে প্রতিদিন তাকে রাস্তায় নামতে হয়। দিনের শুরুতে কয়েকটি ভাড়া পেলে মনে কিছুটা স্বস্তি আসে। আবার দীর্ঘ সময় বসে থেকেও যাত্রী না পেলে বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা।

সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় যানবাহন বাড়ে, বাড়ে যাত্রীর চাপ। একসময় যে সড়ক ছিল প্রায় ফাঁকা, সেখানে শুরু হয় হর্নের শব্দ। সেই ভিড়ের মধ্যেই রিকশা চালিয়ে যান তারা। রোদ, বৃষ্টি, ধুলা ও যানজট তাদের নিত্যসঙ্গী। তবু, প্রতিদিন সকালে রিকশার হ্যান্ডেল ধরে নতুন করে পথচলা শুরু করেন তারা। কারণ তাদের থেমে যাওয়ার সুযোগ খুব কম।


শহর পরিষ্কারের নীরব কারিগর

মানুষের চলাচল শুরুর আগেই ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমে পড়েন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। রাতের জমে থাকা ময়লা, কাগজ, প্লাস্টিক ও ধুলাবালি সরিয়ে তারা প্রস্তুত করেন নতুন দিনের শহর। কোথাও নর্দমার পাশে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করছেন কেউ, কোথাও বড় সড়কের এক পাশ থেকে অন্য পাশে সরিয়ে নিচ্ছেন ময়লার স্তূপ।

দুর্গন্ধ, ধুলাবালি, বর্জ্য ও নানা ধরনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। অনেক সময় মানুষ তাদের কাজের দিকে ফিরেও তাকায় না। অথচ তাদের পরিশ্রম না থাকলে শহরের পরিচিত রাস্তাগুলো খুব দ্রুতই অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠত।

সকালে অফিসে যাওয়ার পথে আমরা যে পরিষ্কার ফুটপাত দেখি, যে সড়কে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারি, তার পেছনে থাকে এই মানুষগুলোর শ্রম। তারা যখন রাস্তা পরিষ্কার করেন, তখন শহরের অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। যখন মানুষ ঘর থেকে বের হয়, তখন তারা হয়ত সরে যান অন্য কোনো সড়কে, অন্য কোনো দায়িত্বে।


নির্মাণশ্রমিকের কাঁধে শহরের ভবিষ্যৎ

ঢাকায় প্রতিনিয়ত কোথাও নতুন ভবন উঠছে, কোথাও পুরনো স্থাপনার পাশে তৈরি হচ্ছে নতুন অবকাঠামো। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে অসংখ্য নির্মাণশ্রমিকের ঘাম। তাদের অনেকেই খুব ভোরে ঘর থেকে বের হন, যাতে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন।

কেউ মাথায় ইট বহন করেন, কেউ বালু ও সিমেন্ট মেশান, কেউ রড বাঁধেন, কেউ আবার উঁচু ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দাঁড়িয়ে কাজ করেন। তাদের হাতে তৈরি হয় এমন সব ভবন, যেখানে একদিন অন্য মানুষ স্বস্তিতে বসবাস করবে কিংবা কর্মজীবন কাটাবে।

কিন্তু যারা অন্যের জন্য ভবন নির্মাণ করেন, তাদের নিজেদের জীবনে নিরাপদ বাসস্থানের নিশ্চয়তা অনেক সময় থাকে না। প্রতিদিনের মজুরির ওপর নির্ভর করে চলে সংসার। কাজ না থাকলে আয় বন্ধ হয়ে যায়। অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনা তাদের জীবনে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

তবু, ভোরের আলো ফুটতেই তারা কর্মস্থলে হাজির হন। তাদের কাছে কাজ মানে শুধু মজুরি নয়, পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা। শহরের উঁচু ভবনগুলো তাই শুধু ইট, বালু ও সিমেন্টের গল্প বলে না। সেগুলো বলে এমন কিছু মানুষের গল্প, যাদের শ্রম দৃশ্যমান হলেও তাদের ব্যক্তিগত সংগ্রাম প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়।


সংবাদপত্রের পাতায় দিনের প্রথম খবর

ভোরের শহরে সংবাদপত্র বিক্রেতাদের ব্যস্ততাও চোখে পড়ার মতো। ছাপাখানা থেকে আসা পত্রিকার বান্ডিল খুলে তারা দ্রুত পত্রিকাগুলো সাজিয়ে নেন। কেউ সাইকেলে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার কেউ হেঁটে পৌঁছে দেন নির্দিষ্ট এলাকার গ্রাহকদের কাছে।

অনেক বাড়ির দরজায় সকালের প্রথম কড়া নাড়া আসে তাদের হাত থেকেই। কেউ ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাড়িয়ে পত্রিকা নেন, কেউ চায়ের কাপ হাতে বসে দিনের খবর পড়েন। কিন্তু সেই খবর পৌঁছে দেওয়ার মানুষটির নিজের দিন শুরু হয় অনেক আগেই।

পত্রিকার পাতায় যখন রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা দেশের নানা ঘটনার বিবরণ ছাপা হয়, তখন সেই সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করেন এই পরিশ্রমী মানুষেরা। তাদের সকাল নির্ভর করে সময়ের ওপর। দেরি হলে গ্রাহকের অভিযোগ, আবার বৃষ্টি কিংবা যানজট থাকলেও নির্ধারিত সময়ে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার চাপ থাকে।

তাদের কাছে প্রতিটি সকাল সময়ের সঙ্গে এক ধরনের লড়াই। শহরের মানুষের হাতে দিনের খবর তুলে দিয়ে তারা নিজেরাও এগিয়ে যান পরবর্তী কাজের দিকে। অথচ তাদের শ্রমের কথা খুব কমই জায়গা পায় সেই সংবাদপত্রের পাতায়।


বাসের স্টিয়ারিংয়ে নতুন দিনের দায়িত্ব

ঢাকার সড়কে সকাল মানেই কর্মব্যস্ত মানুষের ঢল। কেউ অফিসে যাবেন, কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কেউ হাসপাতালে, কেউ আবার ছুটবেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দিকে। এই বিপুল মানুষের চলাচলের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বাসচালকেরা।

অনেক বাসচালকের দিন শুরু হয় ভোরের অন্ধকারেই। গাড়ি পরীক্ষা করা, নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানো, যাত্রী ওঠানো এবং সময়মতো যাত্রা শুরু করার প্রস্তুতি নিতে হয় তাদের। শহরের যানজট বাড়ার আগেই যত বেশি সম্ভব ট্রিপ সম্পন্ন করার চাপও থাকে অনেকের ওপর।

একটি বাসের স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকা মানুষটির দায়িত্ব শুধু গাড়ি চালানো নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাসের যাত্রীদের নিরাপত্তা, সহকারীর জীবিকা এবং সড়কের অন্য মানুষের জীবনও। দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা এবং যানজটের চাপ তাদের কাজকে কঠিন করে তোলে।

সকালে যখন বাসের ভেতর যাত্রীদের ভিড় বাড়ে, তখন চালককে একই সঙ্গে সামলাতে হয় রাস্তার পরিস্থিতি, অন্যান্য যানবাহনের চলাচল এবং যাত্রী ওঠানামার ব্যস্ততা। যাত্রীরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে চান, অথচ সড়কের বাস্তবতা সব সময় তাদের অনুকূলে থাকে না। সেই বাস্তবতার মধ্যেই প্রতিদিন স্টিয়ারিং ধরে এগিয়ে যান বাসচালকেরা।


অদৃশ্য শ্রমে সচল মহানগরী

রিকশাচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, সংবাদপত্র বিক্রেতা কিংবা বাসচালক, তাদের কাজ আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে- তারা প্রত্যেকেই এমন এক শহরকে সচল রাখতে কাজ করেন, যে শহরের মানুষ অনেক সময় তাদের শ্রমের কথা ভাবার অবকাশই পান না।

ঢাকার সকাল কেবল সূর্য ওঠার দৃশ্য নয়। এটি মানুষের শ্রমে শহর জেগে ওঠার গল্প। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঝাড়ুর শব্দ, রিকশার চাকার ঘূর্ণন, নির্মাণস্থলে হাতুড়ির আঘাত, পত্রিকার বান্ডিল খোলার শব্দ এবং বাসের ইঞ্জিনের গর্জন মিলেই তৈরি হয় এই শহরের ভোরের সুর।

এই মানুষগুলোর জীবনেও স্বপ্ন আছে। কেউ চান সন্তানকে ভালোভাবে পড়াশোনা করাতে, কেউ চান নিজের একটি রিকশা কিনতে, কেউ চান অসুস্থ মা-বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে, কেউ আবার চান একটু নিশ্চিন্ত জীবন। তাদের স্বপ্ন হয়ত খুব বড় নয়, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রতিদিন তাদের যে পরিশ্রম করতে হয়, তা কোনো অংশেই ছোট নয়।

একটি শহর কতটা আধুনিক, তা শুধু তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আলোকিত বিপণিবিতান দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই শহর তার শ্রমজীবী মানুষদের কতটা সম্মান দেয়, তাদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য জীবিকার জন্য কতটা দায়িত্ব পালন করে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিচ্ছন্ন রাস্তায় হাঁটি, বাসে চড়ে কর্মস্থলে যাই কিংবা দরজায় পত্রিকা হাতে পাই, তখন এসব সেবার পেছনে থাকা মানুষগুলোর কথা মনে রাখা প্রয়োজন। তাদের শ্রমকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়ার বদলে প্রাপ্য সম্মান দেওয়া দরকার। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, বিশ্রামের সুযোগ এবং সামাজিক সুরক্ষা তাদেরও অধিকার।

ঢাকা প্রতিদিন নতুন করে জেগে ওঠে। কিন্তু সেই জেগে ওঠার গল্পে সবার নাম লেখা থাকে না। অনেক মানুষ ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজ শুরু করেন, আবার দিনের ব্যস্ততা যখন চূড়ায় পৌঁছায়, তখনো তারা ছুটে চলেন জীবিকার সন্ধানে।

তাদের ঘামেই শহরের চাকা ঘোরে, তাদের শ্রমেই স্বাভাবিক থাকে আমাদের প্রতিদিনের জীবন। তাই ঢাকার সকালকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে হলে শুধু সূর্যোদয়ের দিকে তাকালে চলবে না; তাকাতে হবে সেই মানুষগুলোর দিকে, যারা অন্যদের দিন শুরু হওয়ার আগেই নিজেদের দিন শুরু করেন।

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   রিক্সাচালক  হকার  বাসচালক  পরিচ্ছন্নতাকর্মী  নির্মাণশ্রমিক  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: