ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং অন্যান্য রাজনীতিবিদদের ছবি সম্বলিত একটি নির্বাচনী প্রচারণার বিলবোর্ডে হিব্রু ভাষায় লেখা আছে, ‘হয় ডানপন্থী, নয়তো ফিলিস্তিন।’ ছবি : সংগৃহীত ইসরায়েলের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডানপন্থি রাজনীতির প্রতি সমর্থন বাড়ছে। দেশটির প্রথমবারের ভোটারদের প্রায় ৭৫ শতাংশই নিজেদের ডানপন্থী বা মধ্য-ডানপন্থি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। চ্যানেল ১২-এর এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। ইসরায়েলি সমাজের সামগ্রিক প্রবণতার তুলনায় তরুণ ভোটারদের মধ্যে এই ঝোঁক আরও বেশি।
চার বছর পর ইসরায়েলে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে এবার রেকর্ডসংখ্যক নতুন ভোটার অংশ নিতে যাচ্ছেন। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নির্বাচনের পর ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সি পাঁচ লাখের বেশি তরুণ। জরিপ বলছে, তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের (আইডিআই) এক জরিপে দেখা গেছে, তরুণ ইহুদি ইসরায়েলিদের অধিকাংশই মনে করেন, ভোটের মাধ্যমে দেশের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া সম্ভব। তবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার প্রবণতা তুলনামূলক কম হলেও তাদের বড় একটি অংশ ডানপন্থি রাজনীতির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। এই প্রবণতা থেকেই ইসরায়েলের ইহুদি তরুণদের বোঝাতে ‘জেনারেশন রাইট’ বা ‘ডানপন্থি প্রজন্ম’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের এই চিত্রের বাইরে রাখা হয়েছে।
মূলধারায় জায়গা পাচ্ছে কট্টর ডানপন্থা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলে এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং তার ডানপন্থি নীতির জন্য এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের মতো নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতিগুলো আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
২০১৭ সালে স্মোত্রিচ ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকবে শুধু ইসরায়েলিদের। ফিলিস্তিনিদের হয় দেশ ছাড়তে হবে, নয়তো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই থাকতে হবে; অন্যথায় তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ২০২২ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্ব পাওয়ার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি দখল ও অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও মনোভাব তরুণদের একাংশের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলি ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠান নির্মাতা লিওর শ্লেইনের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এক তরুণকে আরবদের হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে দেখা যায়। কীভাবে হত্যা করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে সে বলে, ‘আমাকে একটি ছুরি দিন, আমি তা করব।’
৭ অক্টোবরের হামলা তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে কি না, জানতে চাইলে ওই তরুণ বলে, সে সব সময়ই বর্ণবাদী ছিল। ইসরায়েলে আরবদের বসবাসের অধিকার থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করে সে। পরে জনসমালোচনার মুখে ভিডিওটি সরিয়ে নেন শ্লেইন।
অন্য একটি আলোচনায় গাজায় নিরপরাধ মানুষ আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠে আসে। ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে শ্লেইন তা অস্বীকার করেন। তখন এক ছাত্রী তাঁকে প্রশ্ন করে, এমন কিছু করা উচিত বলে তিনি মনে করেন কি না। শ্লেইনের কাছে ছাত্রীটির এই প্রশ্ন তরুণদের একাংশের মনোভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।
তরুণ ভোটারদের সমর্থন পাচ্ছেন বেন-গভির
ইয়েদিওথ আহরোনোথ পত্রিকার এক জরিপ অনুযায়ী, নতুন ভোটারদের ১৬ শতাংশের বেশি কট্টর ডানপন্থি দলগুলোকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। দক্ষিণ ইসরায়েলের একটি বসতি স্থাপনের সমর্থনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১৮ বছর বয়সি আমিহাইকে বেন-গভিরের ছবি-সংবলিত টি-শার্ট পরা অবস্থায় দেখা যায়। তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন ওৎজমা ইয়েহুদিতি পার্টিকে ভোট দেবেন।
২০২০ সালের নির্বাচনে বেন-গভিরের দল পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। তবে ২০২২ সালে নেতানিয়াহুর সরকারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। এরপর থেকে তরুণ ভোটারদের কাছে নিজের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছেন তিনি।
‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনকে সমর্থনসহ বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পরও বেন-গভিরের প্রতি তরুণদের একাংশের সমর্থন রয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে। মন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রায়ই ইসরায়েলি কারাগার ও আটককেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে ফিলিস্তিনি বন্দী ও আন্তর্জাতিক কর্মীদের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর পরিচিত সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরেও তরুণদের কাছে পৌঁছে যায়।
তার সমর্থকদের মধ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি ‘হিলটপ ইয়ুথ’ নামে পরিচিত উগ্র বসতিস্থাপনকারী তরুণদেরও দেখা যায়। এই গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
আইডিআইয়ের জরিপে আরও দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপ-টেলিগ্রামের মতো বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ তরুণদের রাজনৈতিক তথ্য পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরা খোঁজ না করলেও এসব প্ল্যাটফর্মের ফিডে রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণার মুখোমুখি হন।
তরুণদের কাছে পৌঁছানোর এই মাধ্যমগুলো কীভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ গঠনে ভূমিকা রাখছে, বেন-গভিরের প্রচারকৌশল তার একটি উদাহরণ। ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের এই ডানমুখী প্রবণতা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/জেডি