গাজা যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে ইসরায়েলি সেনাদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গাজা ও লেবাননে দীর্ঘদিনের যুদ্ধে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ইসরায়েলি সেনারা, বাড়ছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে তাদের অভিজ্ঞতা

2026-10-24T10:11:51+00:00
2026-10-24T10:11:51+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
গাজা যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে ইসরায়েলি সেনাদের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
গাজা ও লেবাননে দীর্ঘদিনের যুদ্ধে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ইসরায়েলি সেনারা, বাড়ছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)। আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোর।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া দেশটির বহু সেনা এখন যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও মানসিক আঘাতের সঙ্গে লড়ছেন। তাঁদের মধ্যে বাড়ছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)। ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ আইনসভা নির্বাচনের আগে দেশটির সেনাদের এই মানসিক সংকট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোর।

ইসরায়েলের তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে একদল সেনাসদস্যের সঙ্গে দেখা হয় প্রতিবেদকের। ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সি এই ১৮ সেনা গত এক বছর ধরে নিয়মিত একত্র হন। মনোবিদদের সহায়তায় তারা নিজেদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন এবং একে অন্যকে মানসিক সমর্থন দেন। সম্প্রতি দাতাদের অর্থায়নে একটি কর্মসূচির অংশ হিসেবে তাঁরা এক সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্কে যাচ্ছিলেন।

দলের সদস্যদের একজন লিওর তাপিসার। ২৯ বছর বয়সি এই সাবেক সেনাসদস্য এখন প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর তার মানসিক বিপর্যয়ের শুরু। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিজের ইউনিটে যোগ দিয়ে গাজা সীমান্তের কাছের কিবুতজ এলাকায় যান। সেখানে হামাস ও অন্য ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছিল।

তাপিসারের ভাষ্য, তাকে একটি পুরোনো রাইফেল দেওয়া হয়েছিল, এমনকি তাঁর কাছে যুদ্ধের হেলমেটও ছিল না। খোলা জিপে করে তারা এগিয়ে যাচ্ছিলেন। চারপাশে পোড়া মরদেহের গন্ধ ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশের দৃশ্য তাঁকে আতঙ্কিত করে তোলে। নিজের দেশেও যে যেকোনো মুহূর্তে মারা যেতে পারেন—এই ভয় তাঁকে গ্রাস করেছিল।

পরদিন রাতেও সেই দুঃস্বপ্নের অবসান হয়নি। একটি বাড়িতে ঢুকে রক্তে ভেজা শিশুর খাট দেখার অভিজ্ঞতা তার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। কয়েক দিন পর ইউনিটের সঙ্গে গাজায় প্রবেশ করেন তিনি। পশ্চিম তীরে ১৮ বছর বয়স থেকে সেনাসদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তাপিসার তখন প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষায় তাড়িত ছিলেন।

তার কথায়, ‘প্রথম দিন যোগ দেওয়ার সময় আমার মন ও শরীর বলছিল, যত বেশি সম্ভব মানুষকে হত্যা করব, প্রতিশোধ নেব। তখন আমার মধ্যে প্রচণ্ড ঘৃণা কাজ করছিল।’

চার মাস লড়াইয়ের পর এক রাতে সহযোদ্ধারা তাকে অনবরত কাঁপতে দেখেন। তিনি দাঁড়াতেও পারছিলেন না। তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ১০ দিন পর আবার ইউনিটে ফিরলেও ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, তার শরীর আর যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারছে না। কয়েক মাস পর তাকে সামরিক দায়িত্ব পালনের অনুপযুক্ত ঘোষণা করা হয়।

বেসামরিক জীবনে ফিরে আসার পরও মানসিক লড়াই থামেনি। সহযোদ্ধারা যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও নিজে ফিরে আসায় অপরাধবোধে ভুগতেন তিনি। ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ বন্ধ করে দেন, পরিবার ও বন্ধুদের এড়িয়ে চলতে শুরু করেন।

তাপিসার বলেন, ‘আয়নায় নিজেকে চিনতে পারতাম না। মনে হতো, আমি অর্ধেক মানুষ হয়ে গেছি। পরিবার, প্রেমিকা, বন্ধু—যাদের ভালোবাসেন, তাদের সামনে থেকেও ভালোবাসা অনুভব করতে না পারার অভিজ্ঞতা কেমন, জানেন? মনে হয় ভেতরে কিছুই নেই।’

পিটিএসডির চিকিৎসা শুরুর পর তার উপসর্গ কিছুটা কমেছে। তবে পোড়া গন্ধ, বিকট শব্দ কিংবা প্রেমিকার সঙ্গে ঝগড়ার মতো ঘটনাও এখনো তার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।

বাড়ছে সেনাদের মানসিক সংকট

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ গত জানুয়ারিতে জানিয়েছিলেন, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় দেশটির সেনাবাহিনীতে পিটিএসডির ঘটনা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধজনিত আঘাতের চিকিৎসা নেওয়া ২২ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে ৬০ শতাংশ পিটিএসডিতে ভুগছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মানসিক সংকটের কারণে কেউ কেউ আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন। ইসরায়েলি পার্লামেন্টের গত বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৭৯ জন সেনাসদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।

গত বছরের জুলাইয়ে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট সামরিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘যুদ্ধজনিত মানসিক আঘাত’কে প্রতিবন্ধিতার স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সেনারা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পান।


দেশটির উত্তরাঞ্চলের আফুলা শহরের ক্লালিত-হা’এমেক মেডিকেল সেন্টারের মনোরোগ বিভাগের পরিচালক আলোন রেশেফের আশঙ্কা, মানসিক সংকটের সবচেয়ে কঠিন সময় এখনো আসেনি। তার মতে, যুদ্ধের চাপ কমে এলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য আসতে পারেন। হাসপাতালে ভর্তির অপেক্ষমাণ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, আর রোগীদের সমস্যাও ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে।

রেশেফ বলেন, শুধু পিটিএসডি নয়, বিষণ্নতা ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো সমস্যাও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে আরও তীব্র হতে পারে। তার ভাষায়, ‘ইসরায়েলি সমাজ অসুস্থ। সমাজে ঘৃণা ও সংঘাত অনেক বেশি, কেউ কারও কথা শুনছে না। সুস্থ হতে কয়েক বছর লেগে যাবে।’

‘যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাই না’

যুদ্ধের মানসিক ক্ষত নিয়ে লড়ছেন ৩২ বছর বয়সি আরেক সেনাসদস্য অরও। পেশায় সমাজকর্মী এই সেনা পদাতিক ইউনিটে চিকিৎসাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে তাঁর ৪০০ দিনের বেশি সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কয়েক মাস আগে তিনি পিটিএসডির চিকিৎসা নেওয়ার আবেদন করেন।

অর বলেন, দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে প্রতিটি সেনাই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। সেনাবাহিনীতে থাকলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও বাড়ি ফিরলে মানসিকভাবে ভালো বোধ করেন না তিনি।


চার মাস আগে একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের কাছে টহল দেওয়ার সময় তাদের ইউনিট হামাস যোদ্ধাদের মুখোমুখি হয়। সংঘর্ষে এক সেনা নিহত হন এবং কয়েকজন আহত হন। নিহত সেনার মরদেহ জিপে তোলার দায়িত্বও পালন করতে হয়েছিল অরকে। সেই ঘটনার পর থেকে দৃশ্য, গন্ধ ও স্মৃতি তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। এখন তিনি সম্মুখযুদ্ধের বদলে নজরদারির দায়িত্ব পালন করছেন এবং মনোচিকিৎসকের সহায়তা নিচ্ছেন।

অর বলেন, ‘নিজের যত্ন নিতে হবে, সুস্থ হতে হবে, যাতে দেশের জন্য আবার দায়িত্ব পালন করতে পারি।’

তবে নেতানিয়াহু সরকারের যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে তার আস্থা কমেছে। গাজায় বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তিনি একমত নন বলে জানান। তাঁর মতে, যুদ্ধ ইসরায়েলি সমাজের জন্য ক্ষতিকর এবং এটি উগ্রপন্থীদের আরও উৎসাহিত করছে।

‘আমি আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাই না,’ বলেন অর। ‘অনেক সময় মনে হয়, আর সহ্য করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারা আবারও আমার কাছে আরও কিছু চায়, আর আমিও কোনোভাবে নিজের সীমা আরও একটু বাড়িয়ে নিই।’

ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে সেনাদের এই অভিজ্ঞতা যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক প্রভাবকে সামনে এনেছে। মনোবিদ রেশেফ আশা করছেন, নির্বাচনের পর যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তারা দেশটির মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটকে গুরুত্ব দেবে। 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   গাজা যুদ্ধ  দুঃস্বপ্ন  ইসরায়েলি সেনা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: