ময়মনসিংহ থানা। ছবি : সংগৃহীতময়মনসিংহ মহানগরীসহ পুরো জেলায় চুরি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে বিস্তার ঘটছে মাদকের। পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে ব্যস্ত সড়ক—বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাসাবাড়িতে চুরি, দোকানপাটে চুরি এবং মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। যাত্রীবেশে চালককে জিম্মি করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। এসব অপরাধের পেছনে মাদকের সহজলভ্যতা ও মাদক কারবারিদের তৎপরতাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকেরা।
নগরীর গাঙ্গিনারপাড়, পাটগুদাম, ব্রিজ মোড়, চরপাড়া, কাঁচিঝুলি, কৃষ্টপুর, মিন্টু কলেজ রেলক্রসিং, সানকিপাড়া, সেহড়া বলাশপুর ও কেওয়াটখালী এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় একা চলাচল করতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, বাইসাইকেল কিংবা হেঁটে চলা মানুষের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্রের মুখে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বাসাবাড়িতেও বেড়েছে চোরের উৎপাত। তালা ভেঙে ফাঁকা বাসায় ঢুকে চুরি, জানালা দিয়ে মালামাল নিয়ে যাওয়া এবং জানালা ও ভেন্টিলেটরের থাই গ্লাস খুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি দোকানপাট ও মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অলিগলিতে গড়ে ওঠা মাদকের আড্ডা ও কারবারি চক্রের তৎপরতা চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বাড়িয়ে তুলছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহর ও শহরতলির বিভিন্ন পরিত্যক্ত ভবন, রেললাইনের পাশ এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় নিয়মিত মাদকের আসর বসে। কৌশলে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রি করা হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, উঠতি বয়সী কিশোর ও যুবকদের একটি অংশ মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও অপরাধ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ময়মনসিংহ জেলায় ৮৮টি হত্যাকাণ্ড, ২০৭টি ধর্ষণ এবং ২০৪টি চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ৮৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১১১ জন, ২০৭টি ধর্ষণের ঘটনায় ১৭৯ জন এবং ২০৪টি চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৫০৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের পাশাপাশি কয়েকটি ঘটনায় অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করেছে এসআরবি।
এদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার ১৪টি থানায় মাদক-সংক্রান্ত ১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ১ হাজার ৭৯০ জনকে। একই সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় ৪৬ হাজার পিস ইয়াবা, ৫৫৯ গ্রাম হেরোইন, ২৪৯ কেজি গাঁজা, ১ হাজার ৮০৫ লিটার দেশি মদ, ১ হাজার ৫৩ বোতল বিদেশি মদ, ৩ হাজার লিটার ওয়াশ, ১ হাজার ৪২৯ অ্যাম্পল ইনজেকশন এবং ৩ হাজার ৮০৮ পিস ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার করেছে পুলিশ।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চুরি-ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই আইনি ঝামেলার আশঙ্কায় থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা করতে চান না। কেউ কেউ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেই থেমে যান, আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশের টহলে শিথিলতা এবং চিহ্নিত অপরাধীদের জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
নগরীর চরপাড়া এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, হাসপাতাল মোড় ও আশপাশের এলাকায় রাতে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে গেছে। পকেটে মোবাইল বা টাকা থাকলে কখন যে ছিনতাইকারীদের হাতে চলে যাবে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। অলিগলিতে মাদকের স্পটগুলো বন্ধ না করলে এই ছিনতাই কোনো দিনই থামবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শান্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত মাদকের মূল আস্তানাগুলো উচ্ছেদ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত পুলিশি টহল জোরদার না করলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিক দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, মাদক ও অপরাধ দমনে পুলিশের নিয়মিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বিট পুলিশিং ও রাতের টহল বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে নয়, সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি।
সময়ের আলো/জোই