রাত পোহালেই ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, ভাগ্যপরীক্ষায় নেতানিয়াহু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং দুর্নীতির মামলার চাপ— সব মিলিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে প্রধানমন্ত্রী

2026-10-26T22:09:45+00:00
2026-10-26T22:11:00+00:00
 
  সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১০ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
রাত পোহালেই ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, ভাগ্যপরীক্ষায় নেতানিয়াহু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৯ পিএম  আপডেট: ২৬.১০.২০২৬ ১০:১১ পিএম
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং দুর্নীতির মামলার চাপ— সব মিলিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার দল লিকুদ পার্টি ক্ষমতায় ফিরতে পারে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। তবে নির্বাচনে কোন দল সবচেয়ে বেশি ভোট পেল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন দেশটির নাগরিকেরা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটি দেশটির প্রথম নির্বাচন। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেতানিয়াহুর ভূমিকা, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব নির্বাচনী আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসা নেতানিয়াহুর জন্য এই নির্বাচনকে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনমত জরিপে তার দল পিছিয়ে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেলে ক্ষমতায় ফেরার সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনে জয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৬১ আসন

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তালিকায় ভোট দেন। দেশব্যাপী আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী নেসেটের আসন বণ্টন করা হয়।

পার্লামেন্টে আসন পেতে একটি দলকে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। তবে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দলটির পক্ষেও এককভাবে সরকার গঠন করা সহজ নয়। কারণ, ১২০ সদস্যের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো একক দল একা এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তাই নির্বাচনের পর বিভিন্ন দলকে সমঝোতার মাধ্যমে জোট সরকার গঠন করতে হয়। নির্বাচনে প্রথম স্থান অর্জন করেও কোনো দল যদি পর্যাপ্ত সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে তাদের সরকার গঠনের পথ কঠিন হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতায় নেতানিয়াহুর দল কতটি আসন পাবে, পাশাপাশি অন্য ডানপন্থী, মধ্যপন্থী ও বামপন্থী দলগুলোর অবস্থান কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সংকট

১৯৯৬ সালে প্রথমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এরপর বিভিন্ন মেয়াদে প্রায় দুই দশক দেশটির সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ডও তার।

সমর্থকদের কাছে নেতানিয়াহু একজন দৃঢ়চেতা নেতা, যিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিতে সক্ষম। তবে সমালোচকদের মতে, তার নেতৃত্বে দেশটির সামরিক সংঘাত বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। হামলার আগাম ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগও নেতানিয়াহু সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ায়। পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায় তার সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে।

এর পাশাপাশি দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও বিতর্কিত করেছে। গাজা যুদ্ধসংক্রান্ত অভিযোগের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও তার আন্তর্জাতিক অবস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

সব মিলিয়ে নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা নেতানিয়াহুর সামনে এখন ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ।

বিরোধীদের একাধিক মুখ, লক্ষ্য এক

নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরে একাধিক নেতা ও রাজনৈতিক দল সক্রিয় রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিড, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগডর লিবারম্যান এবং সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলানের মতো নেতারা দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

নাফতালি বেনেট ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও অতীতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার থেকে সরে এসে তার বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে মধ্যপন্থী নেতা ইয়ার লাপিডও নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। অতীতে তাদের রাজনৈতিক সহযোগিতা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে ভূমিকা রেখেছিল।

সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগডর লিবারম্যানও নেতানিয়াহুর অন্যতম সমালোচক। একসময় তার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত লিবারম্যান ২০১৮ সালে সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। গাজা নিয়ে নেতানিয়াহুর নীতির সমালোচনা করে তিনি পরবর্তী সময়ে বিরোধী অবস্থান আরও জোরালো করেন।

এদিকে সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটস দল বামপন্থী ও মধ্য-বামপন্থী ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে। দলটি ইসরায়েলের ঐতিহ্যবাহী লেবার পার্টি এবং মেরেৎজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে একত্র করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছে।

সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের মতো নেতারাও নেতানিয়াহুর বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন। সামরিক অভিজ্ঞতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত পারিবারিক ত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে তাঁরা ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

তবে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য থাকায় নির্বাচনের পর তাদের মধ্যে কার্যকর জোট গঠন কতটা সম্ভব হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।


আরব দলগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোও সরকার গঠনের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। রা’আম এবং জয়েন্ট লিস্টের মতো দলগুলো বিভিন্ন সময়ে সংসদীয় সমর্থন ও জোটের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ ধরনের দল সরাসরি কোনো শিবিরে যোগ না দিলেও সংসদে তাদের আসনসংখ্যা সরকার গঠনের হিসাব বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে ডানপন্থী ও বিরোধী জোটের মধ্যে আসনের ব্যবধান কম হলে ছোট দলগুলোর সমর্থন নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া নতুন ও অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর নির্বাচনী পারফরম্যান্সও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী সীমা পার হতে ব্যর্থ হলে কোনো দলের ভোট সংসদে আসনে রূপান্তরিত হবে না। আবার অল্প ব্যবধানে সীমা পার হওয়া কোনো দলও জোট গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

ভোটের পর শুরু হবে জোট গঠনের লড়াই

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হলেই সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় না। ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে নেসেটের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রেসিডেন্ট এমন একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন, যিনি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা রাখেন।

এরপর সংশ্লিষ্ট নেতাকে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে জোট গঠন করতে হয় এবং নেসেটের আস্থা অর্জন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠন সম্ভব না হলে অন্য প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

এই জটিল ব্যবস্থার কারণে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলই যে শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বরং কোন দল কার সঙ্গে জোট করতে রাজি হচ্ছে এবং কে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন নিশ্চিত করতে পারছে, সেটিই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখে।

ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

এবারের নির্বাচন শুধু নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়; এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতি, ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির ভূমিকার দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে।

নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তার কঠোর নিরাপত্তানীতিকে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং নতুন নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তবে বিরোধী শিবিরের মধ্যে মতপার্থক্য, ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং সম্ভাব্য জোটের জটিলতা নেতানিয়াহুর জন্য এখনো সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। ফলে জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকলেও নির্বাচনের পর সরকার গঠনের দৌড়ে তার দল কতটা এগিয়ে থাকবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত আসনসংখ্যা ও জোটের সমীকরণের ওপর।

সময়ের আলো/এসকে
  বিষয়:   ইসরায়েল  নির্বাচন  ভাগ্যপরীক্ষা  নেতানিয়াহু  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: